✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ৪ দিন ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের ১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) আসামিদের আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। আসামি পক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন রিমান্ড নামঞ্জুর ও জামিন চেয়ে শুনানি করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত রিমান্ডের আদেশ দেন।
এর আগে বিকেল ৩টা ১১ মিনিটে গাজী নজরুলকে বুলেট প্রুপ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে এজলাসে আনা হয়। এসময় তিনি তার আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং মামলার এজাহার পড়ে দেখেন। পরে ওকালতনামায় সই করেন।
৫ কারণে রিমান্ড চাওয়া হয়
১. ভিকটিম মরিয়ম ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যুবরণ করার সময় একই বাসায় এজাহারনামীয় গ্রেফতার আসামিরা ছিল। তাই ভিকটিমের আত্মহত্যায় তাদের প্রভাব আছে কি না তা উদঘাটন।
২. ভিকটিমকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার বিষয়ে আসামিদের ভূমিকা উদঘাটন।
৩. ভিকটিম মরিয়মের আত্মহত্যায় এজাহারনামীয় পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেফতার করা।
৪. ভিকটিম মরিয়মের আত্মহত্যায় অজ্ঞাতনামা আসামি জড়িত রয়েছে কি না তা শনাক্ত করে গ্রেফতার করা।
৫. মামলার মূল রহস্য উদঘাটন করা।
এদিন দুপুর ২টা ২০ মিনিটে তাদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (সিএমএম) আনা হয়। এ সময় তাদের সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। পরে কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে ৩টা ১১ মিনিটে তাদেরকে এজলাসে তোলা হয়। এ সময় তার পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবীদের সাথে কথা বলেন ও মামলার এজাহার পড়ে দেখেন। ৩টা ১৪ মিনিটে এজলাসে আসেন বিচারক। আসামি পক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান আদালতের অনুমতি নিয়ে ওকালতনামায় স্বাক্ষর করান।
এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে বলেন, ঘটনার সময় তারা একই বাসায় অবস্থান করছিলেন। ভিকটিমের আত্মহত্যায় তাদের প্রভাব আছে কিনা তা উদঘাটনসহ আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় সহায়তা করেছেন কি না এসব তথ্য উদঘাটনের জন্য তাদেরকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।
শুনানিতে আসামি পক্ষের আইনজীবী আদালতকে বলেন, গাজী নজরুল ৪ বারের সংসদ সদস্য এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। দুরারোগ্য এসব অসুখের চিকিৎসা নিচ্ছেন। এমতাবস্থায় দেশের কোন থানায় তাকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পরিবেশ নেই। তাকে রিমান্ডে নেওয়ার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। এসময় জামিনের প্রার্থনা করে তিনি আদালতকে বলেন, উনি পালিয়ে যাওয়ার লোক নন। যেহেতু একটা ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে পুলিশ বিস্তর তদন্ত করতে পারে। তদন্ত সংস্থাকে যেকোনো সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছেন তিনি। এ পর্যায়ে তার রিমান্ড বাতিল ও জামিন দেওয়া হোক।
অপরদিকে রাষ্ট্র পক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিহতের বাবা পেশায় একজন মুদি দোকানি। তার বয়স ৪০ বছর আর নিহতের বয়স ১৯ বছর। নিহতের মামা এই আসামির ড্রাইভার ছিলেন। তার মাধ্যমে নিহতের সঙ্গে আসামির পরিচয়। এরপর বিভিন্ন কলা কৌশল, প্রলোভন দেখিয়ে তাকে স্ত্রী হতে বাধ্য করেছেন। ১ম স্ত্রীকে বিষয়টি গোপন করে বিভিন্ন হোটেল মোটেলে যান। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ঘটনার ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় একটি মামলাও হয়।
তিনি বলেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় বেশ কিছু সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। সেখানে নিহতের মৃত্যুর কারণ উল্লেখ আছে। এটা আত্মহত্যা নাকি হত্যা এখনও পরিষ্কার না। হত্যার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিহতের সঙ্গে পরিচয়ের পর বিয়েতে বাধ্য করার পরিকল্পনা, ন্যাম ভবনে আনা সবকিছুতে একটা পরিকল্পনা ছিল। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এসব উঠে আসবে।
শুনানিতে তিনি আরও বলেন, আসামিরা জামায়াতে ইসলামীর সদস্য। গাজী নজরুল জামায়াতের এমপি। তারা নাকি সৎ লোকের শাসন কায়েম করতে চান। এসময় বিচারক থামিয়ে দিয়ে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের কথা না বলে এই মামলার বিষয়বস্তু নিয়ে বলেন। পরে প্রসিকিউটর ফারুকী নিহতের মৃত্যু রহস্য উদঘাটনের জন্য আসামিদের রিমান্ড চান।
এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, মামলার এজাহার ও ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী এটা যে আত্মহত্যা তা সুস্পষ্ট। আসামিদের অসুস্থতা ও বয়স বিবেচনা করে জামিনের প্রার্থনা করেন তিনি। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে দুপুর ৩টা ৩০ মিনিটে বিচারক রিমান্ডের আদেশ দিয়ে এজলাস ত্যাগ করেন। পরে ৩টা ৩৩ মিনিটে পুনরায় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে তাদের কাঠগড়া থেকে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এ সময় উপস্থিত আইনজীবীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।
গতকাল রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মরিয়ম খাতুনের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরে বাংলা নগর থানায় একটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন। মামলায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং শ্যালক ওবায়দুর রহমান—এই ৩ জনকে আসামি করা হয়।
গত জুলাইয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
গত ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় দলটির গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে বহিষ্কার ও একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি অবগত করে জামায়াত।
অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে গত ২১ জুলাই গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। এই মামলায় হাইকোর্ট থেকে গত ১০ আগস্ট ৮ সপ্তাহের জামিন পান গাজী নজরুল ইসলাম।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, মামলার বাদী ওবায়দুর রহমান পল্লবীর কালশী এলাকার ‘রোজগার্ডেন টাওয়ার’-এ তার বোনের বাসায় থাকতেন। তিনি গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়ির চালক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। আত্মীয়তার সূত্রে নজরুল ইসলাম ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। একপর্যায়ে নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওবায়দুরের ভাগ্নির অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি টের পেয়ে ওবায়দুর তার পরিবারকে জানান এবং নজরুল ইসলামকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নজরুল ইসলাম তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। সম্প্রতি মগবাজারের একটি চক্র নজরুল ইসলাম ও তার ভাগ্নির কিছু ‘অপ্রীতিকর ভিডিও’ সংগ্রহ করে নজরুলকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন। নজরুল ইসলামের ধারণা হয়, ওবায়দুরই গোপন ভিডিও ধারণ করে সংবাদমাধ্যম ও ওই চক্রের হাতে তুলে দিয়েছেন। এ নিয়ে বিরোধের জেরে গত ১৪ জুলাই নজরুল ইসলামের নির্দেশে অন্য আসামিরা তার ওপর হামলা চালায়।
ওই দিন বেলা ১১টার দিকে আসামি আমিনুর রহমান তাকে কৌশলে ড্রয়িংরুমে ডেকে নেন। সেখানে অন্য আসামিরা মিলে তাকে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে আমিনুর তাকে ফ্লোরে ফেলে গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা করেন। তখন তার মা তাহমিনা ও ছোট বোন মীম এগিয়ে এসে চিৎকার শুরু করলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। আহত অবস্থায় তাকে স্থানীয় কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আসামিরা তাকে যেখানে পাবে সেখানেই হত্যা করবে বলে হুমকি দিতে থাকে বলে মামলার বিবরণে জানানো হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গাজী নজরুল ইসলাম।
