ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন: পদদলিত হয়ে ৬ জনের মৃত্যু

✍︎ ময়মনসিংহ প্রতিনিধি ✍︎

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনে আগুনের ঘটনায় পদদলিত হয়ে শিশুসহ ৬ জন মারা গেছেন। সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে লাগা আগুন ও ধোঁয়া দেখে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্কে অনেকে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসেন। এ সময় হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে ২০ জন আহত ও ছয় জন নিহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বসী গ্রামের হাজেরা বেগম (৫০), ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের শাহজাহান (৪০), একই উপজেলার আহমদ আলীর ছেলে রমজান (৩৮), হোসেন আলীর ছেলে জাহানারা (৫০) এবং তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুমা (৩৫)। নিহত অপর একজন অজ্ঞাতপরিচয় শিশু।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আবদুল্লাহ আল-মামুন পদদলিত হয়ে ৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে সোমবার সন্ধ্যায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাত পৌনে ১১টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে পদদলিত হয়ে কেউ মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্যের প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাইনি। এ ধরনের কোনো প্রমাণ থাকলে আমাকে দেখান, আমি যাচাই করে দেখব। আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেই তথ্যও সঠিক কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।’

একটি টেলিভিশনে ছয়জন মারা যাওয়ার তথ্য প্রচার হওয়ার বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এস এম হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, কোনো তথ্য নিশ্চিত না হয়ে বলা উচিত নয়। আগে তথ্য নিশ্চিত হতে হবে। নিশ্চিত না হয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের জরুরি বিভাগের যে তালিকা আমাকে দেখানো হয়েছে, সেখানে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নেই। আমার কাছে আরও একটি তালিকা আছে, সেটিও যাচাই করে দেখব। মর্গের তথ্যও নেওয়া হয়েছে। তবে মর্গের তথ্যের সঙ্গে পাওয়া অন্য তথ্যের মিল নেই। সব তথ্য মিলিয়ে দেখার পরই প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

এদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম সোমবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আগুনে সরাসরি মৃত্যুর ঘটনা স্বীকার করেননি। তবে হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি এক কর্মকর্তা জানান, আগুনের ঘটনায় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে এবং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে ৬ জন মারা গেছেন এবং ২০ জন আহত হয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে নতুন আটতলা ভবনের লিফট কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগে। কন্ট্রোলার মেশিনের বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়। কন্ট্রোল রুম থেকে বের হওয়া ধোঁয়া ভবনের বিভিন্ন তলায় ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।

তিনি বলেন, খবর পেয়ে ময়মনসিংহ সদর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল ও ঈশ্বরগঞ্জ স্টেশনসহ পাঁচটি স্টেশনের ১০টি ইউনিটকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ভবনের প্রতিটি তলায় তল্লাশি চালিয়ে আগুনের অবস্থান শনাক্ত করেন এবং পৌনে ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

সরেজমিন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শত-শত রোগী হাসপাতাল চত্বরে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে অনেক গুরুতর রোগী রয়েছেন। কারও হাত ভাঙা, আবার কারও মাথায় ব্যান্ডেজ। আতঙ্কে অনেক রোগী কান্নাকাটি করছেন।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাসপাতালে থাকা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা জীবন বাঁচাতে সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে চেষ্টা করেন। মাত্র একটি সিঁড়ি দিয়ে নামার সুযোগ থাকায় সবাই ভীড়ের মধ্যে নামতে চেষ্টা করেন। এ সময় আহত হয়ে শিশুসহ ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা ছয়জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান বলেন, আগুন লাগার কারণ ও সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

ময়মনসিংহের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানিয়েছেন, ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন। সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও র‍্যাবের কর্মকর্তারা বিষয়টি তদন্ত করছেন।

তিনি আরও জানান, নিহতদের তালিকা যাচাই এবং তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় এখনো কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। প্রয়োজন হলে তা করা হবে। নিহতের সংখ্যা কীভাবে জানা গেল, সে বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তথ্য নিশ্চিত হলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের ডিআইজি, র‍্যাবের অধিনায়ক, জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *