দুটি নাকবা ও ৯৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারীর জীবনসংগ্রাম

✍︎ মিডল ইষ্ট আই ✍︎

দুটি নাকবা, টানা বোমাবর্ষণ, অনাহার, বাস্তুচ্যুতি আর একে একে পরিবারের ৭০ জন সদস্যকে হারানোর পরও নিজের জন্মভূমি ছাড়তে নারাজ ৯৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী ফাতেমা ওবাইদ। ১৯৪৮ সালের নাকবার সাক্ষী এই বৃদ্ধা গাজায় চলমান ইসরায়েলি নির্বিচার গণহত্যাকে দেখছেন আরও ভয়াবহ এক বিপর্যয় হিসেবে। তাঁর ভাষায়, ‘প্রথম নাকবায় মানুষ ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়েছিল। কিন্তু এবার আমরা হারিয়েছি পুরো একটি ইতিহাস।’

গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের একটি পরিত্যক্ত ভবনে নাতি-নাতনিদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ফাতেমা। সেখান থেকেই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে তিনি বলেন, ‘অসংখ্য মানুষের পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন সব ছেলেমেয়ে হারিয়ে গেছে, যাদের ক্ষতি কয়েক দশকেও পূরণ হবে না। ১৯৪৮ সালে যা করতে পারেনি, এখন সেটাই করছে ইসরায়েল।’

ফাতেমার জন্ম গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকায়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় জায়নবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় লাখো ফিলিস্তিনির মতো তাঁকেও সাময়িকভাবে ঘর ছাড়তে হয়েছিল। কয়েক মাস পর যুদ্ধবিরতি হলে তিনি ফিরে আসেন এলাকায়। কিন্তু ৭৫ বছরের বেশি সময় পর আরও নির্মমভাবে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় শুজাইয়ার বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যে এলাকায় তাঁর পুরো জীবন কেটেছে, সেটি এখন ধ্বংসস্তূপ। বারবার উচ্ছেদের মুখে পড়ে অন্তত ১০ বার আশ্রয় বদলেছেন তিনি।

ফাতেমা বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে বোমা হামলা হয়েছে। আমার ছেলে, নাতি-নাতনিসহ পরিবারের ৭০ জনের বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন। আমরা শুধু বাড়িই হারাইনি, হারিয়েছি পুরো পূর্ব গাজাকে।’

১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের নাকবায় প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। নিহত হন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। আর চলমান গাজা যুদ্ধে দুই বছরে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। যুদ্ধবিরতির পরও বাস্তুচ্যুতদের বড় অংশই এখনও তাঁবুতে বসবাস করছেন।

যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বাসিন্দাদের দক্ষিণে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে ফাতেমা গাজা সিটি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর কাছে আবার ঘর ছাড়ার অর্থ ছিল আরও ভয়াবহ এক নাকবার পুনরাবৃত্তি।

তিনি বলেন, ‘এমন দিন গেছে, যখন এক ফোঁটা পানিও পাইনি। খাবার ছিল না। পালাতে হয়েছে। এতে আমার শরীর ভেঙে গেছে। তবুও আমি গাজা ছাড়িনি। জীবনের শেষ সময়ে নিজের শহরের বাইরে কবরস্থ হতে চাইনি।’

নিজের অতীত জীবনের স্মৃতি বলতে এখন তাঁর কাছে রয়েছে শুধু এক জোড়া কানের দুল। ফাতেমা বলেন, ‘৮০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি বিয়ের পোশাক, স্বামীর কাপড় ও নানা স্মৃতি যত্ন করে রেখেছিলাম। সব ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু ছোটবেলায় বাবার উপহার দেওয়া এই দুল দুটি টিকে আছে। এগুলো বাবার স্মৃতিচিহ্ন বলে কখনও খুলে রাখিনি।’

বর্তমানে গাজায় ১৯৪৮ সালের নাকবার জীবিত সাক্ষীর সংখ্যা খুবই কম। চলমান যুদ্ধে অন্তত চার হাজার ৮১৩ জন বৃদ্ধ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ফাতেমা ওবাইদের সবচেয়ে বড় কষ্ট নিজের ভূমি হারানোর বেদনা। তাঁর ভাষায়, ‘নিজের মাটি থেকে উপড়ে যাওয়া এবং এত বছর পরও উদ্বাস্তু অবস্থায় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে কষ্টের আর কিছু নেই।’ 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *