✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
চলতি বছর শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার নাভি পিল্লাই (Navi Pillay)। শুক্রবার বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টায় নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাঁর নাম ঘোষণা করে। শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন তিনি।
নোবেল পুরস্কারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, আইনের সর্বজনীন নীতির প্রতি অটল আস্থা এবং দৃঢ় নৈতিক অবস্থান নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা নেলসন ম্যান্ডেলা ও অন্যদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন। পরে তিনি সমসাময়িক সময়ের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আদালতের মামলায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়জুড়েই আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে।
নোবেল কমিটি আরও জানিয়েছে, নাভি পিল্লাই রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় এনেছেন। পাশাপাশি, সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছেন। তিনি যে দায়িত্বই পালন করেছেন, সেখানেই আইনের শাসন মেনে চলার ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
নবনেথম পিল্লাই নাভি পিল্লাই নামে সমধিক পরিচিত। তিনি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার সুরক্ষার ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত নাম। ১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নেওয়া পিল্লাই নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান নারী হিসেবে তিনি হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে ডক্টরেট অর্জন করেন।
নিজ দেশে ফেরার পর ১৯৬৭ সালে তিনি নাটাল প্রদেশের প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে নিজস্ব আইন পেশা শুরু করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার চরম বর্ণবাদী বা অ্যাপারথেইড ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথে ও আদালতে তিনি ছিলেন সোচ্চার। সেই কঠিন সময়ে নেলসন ম্যান্ডেলাসহ বহু বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামীর পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজর কাড়েন।
পরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিল্লাইয়ের ভূমিকা মানবাধিকারের সংজ্ঞাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে তিনি জাতিসংঘ কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক রুয়ান্ডা অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’-এর বিচারক মনোনীত হন এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিচারক থাকাকালে রুয়ান্ডার গণহত্যা মামলায় তিনি এক যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে প্রথমবার যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণকে ‘গণহত্যার উপাদান’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর ২০০৩ সালে তিনি হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হন।
মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর অসামান্য দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ মেয়াদে তিনি সিরিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের সংঘাতময় অঞ্চলের যুদ্ধাপরাধ, বাকস্বাধীনতা হরণ ও সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেন। বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালতের সর্বোচ্চ আসন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নাভি পিল্লাই নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও বিশ্বজনীন মানবতাবাদী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এর আগে, গত বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ভেনেজুয়েলায় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরতন্ত্র থেকে ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের সংগ্রামে অবদানের জন্য তাঁকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
১৯০১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। ২০২৬ সালে পুরস্কারটির ১২৫ বছর পূর্ণ হলো। এ বছরের পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। আগামী ১০ ডিসেম্বর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে ১৩ অক্টোবর।
পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।
শুরুতে নোবেল বিজয়ীদের প্রায় দেড় লাখ ক্রোনা দেওয়া হতো। বাড়তে বাড়তে ১৯৮১ সালে তা ১০ লাখ ক্রোনা হয়। এরপর পুরস্কারের আর্থিক মূল্য দ্রুত বাড়ানো হয়। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো এর পরিমাণ ১ কোটি ক্রোনা হয়।
সর্বশেষ এ বছরের জানুয়ারি মাসে বাড়ানো হয় নোবেল পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী। এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা মোট ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (৯ লাখ ৮৬ হাজার ডলার) পাবেন, যা আগের চেয়ে ১০ লাখ ক্রোনা বেশি। নোবেল ফাউন্ডেশনের তহবিলের উন্নতি হওয়ায় এ বছর পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ফাউন্ডেশনের তহবিলে টান পড়ায় ২০১২ সালে পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি ক্রোনা থেকে কমিয়ে ৯০ লাখ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে তা বাড়িয়ে ৯০ লাখ এবং ২০২০ সালে ফের এক কোটিতে উন্নীত করা হয়।
গত এক দশকে ইউরোর বিপরীতে প্রায় ৩০ শতাংশ দর হারিয়েছে সুইডিশ ক্রোনা। ফলে পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ লাখ ক্রোনা বাড়ানো হলেও সুইডেনের বাইরে তা ততটা বাড়বে না।
২০১৩ সালে আর্থিক সম্মানী কমিয়ে ৮০ লাখ ক্রোনা করা হয়। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় এই পুরস্কারের পরিমাণ দাঁড়াত ১২ লাখ ডলার। সেটা বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনা হলেও বিনিময় হারের খেলায় ২০২৪ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ডলারের কম। মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে নোবেল পুরস্কারের আর্থিক মূল্যমান খুব একটা বাড়েনি।
বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনার মূল্যমান দাঁড়ায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার বেশি।
