✍︎ হবিগঞ্জ প্রতিনিধি ✍︎
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজীব আহমেদ রিংগন ও বৃন্দাবন সরকারি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান রিয়াদসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন হবিগঞ্জ জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তাহের রুবেল।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে হামলার প্রতিবাদ, মামলা দায়ের এবং আহতদের খোঁজখবর নিতে হবিগঞ্জে যাওয়ার পথে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা একাধিক স্থানে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন।
বুধবার বিকেল ৫টার দিকে হবিগঞ্জের মিরপুর এলাকায় পুলিশ এনসিপির গাড়িবহর আটকে দেয়। দীর্ঘ সময় পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করেও অগ্রসর হতে না পেরে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতারা সড়কে অবস্থান নেন। বৃষ্টির মধ্যেই চলে তাদের অবস্থান কর্মসূচি।
সাংবাদিকদের নাহিদ ইসলাম বলেন, “হবিগঞ্জে তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিল হামলার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, আহতদের দেখতে যাওয়া এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা”।
তিনি অভিযোগ করেন, মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জ পর্যন্ত পথে কয়েক দফায় বালুবাহী ট্রাক, ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন যানবাহন দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। পরে মিরপুর এলাকায় পুলিশ তাদের আটকে দেয়।
তিনি বলেন, “প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করায় তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমিতসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে শুধু মামলা করতে এবং আহতদের দেখতে যেতে চেয়েছিলেন। তবে পুলিশ তাদের সেই সুযোগ দেয়নি”।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা কন্যা ভাস্কর্য এলাকায় সড়ক বন্ধ করে এনসিপির গাড়িবহর আটকে দেওয়া হয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে এনসিপির নেতাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. ওয়াহিদুজ্জামান রাজু বলেন, “নিরাপত্তাজনিত কারণেই এনসিপির নেতাকর্মীদের অগ্রযাত্রা সাময়িকভাবে আটকে দেওয়া হয়েছিল”।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ সড়কের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্য এলাকায় প্রথম পুলিশি ব্যারিকেডের মুখে পড়ে এনসিপির গাড়িবহর। এ সময় গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ডা. মাহমুদা মিতুসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে এনসিপির নেতাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ সময় হাসনাত আবদুল্লাহ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কিতে জড়াতে দেখা যায়। পুলিশও তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আপনি যদি পারেন আমাদের নিরাপত্তা দেবেন। আর যদি না পারেন, তাহলে আমরা নিজের দায়িত্বে চলে যাব। কোন আইনে আমাদের বাধা দিচ্ছেন?’
জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করলে হাসনাত বলেন, ‘নিরাপত্তার হুমকি যারা সৃষ্টি করছে, তাদের না ধরে আমাদের পথরোধ করা হচ্ছে। হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করে শ্রীমঙ্গলে রাস্তা আটকে দেওয়া বেআইনি।’
পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে এনসিপির নেতাকর্মীরা হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দিলেও হবিগঞ্জ সীমান্তের রশিদপুর গ্যাসফিল্ড এলাকায় পৌঁছালে আবারও ট্রাক ফেলে সড়ক অবরোধ করে তাদের আটকে দেওয়া হয়। সেখানে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদের সঙ্গে নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহর দীর্ঘ আলোচনা হয়। এ সময় প্রবল বৃষ্টির মধ্যে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সড়কে বসে অবস্থান নেন। পরে তারা হবিগঞ্জে প্রবেশ করে মামলা দায়ের করে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেও পুলিশ তাতে অনুমতি দেয়নি।
দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা বাগবিতণ্ডা ও অবস্থান কর্মসূচির পর রাত ৮টার দিকে হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার সড়কের কামাইছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন এনসিপি নেতারা।
হবিগঞ্জ জেলা এনসিপির আহ্বায়ক আবু হেনা মোস্তফা কামাল দাবি করেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা শেষে সার্কিট হাউসের উদ্দেশে যাওয়ার পথে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়িবহরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। এতে সারজিস আলম, জেলা সদস্য সচিব মুবিন বারীসহ অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হন।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার হয়ে সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সারজিস আলম। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিকভাবে না দিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। হামলায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং তিনি নিজেও পায়ে আঘাত পান।
এনসিপির নেতাদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ এনে বুধবার বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল ও যুবদল।
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিংগন বলেন, এনসিপির নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণেই হবিগঞ্জের ছাত্র-জনতা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এতে ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, এনসিপির নেতারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিএনপি এবং দলের জাতীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। এ কারণে হবিগঞ্জের সাধারণ ছাত্র-জনতা তাদের ধাওয়া করেছে।
বিএনপি ও এনসিপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাত, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় বুধবার হবিগঞ্জ শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মঈনুল হক জানান, ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকায় হবিগঞ্জ শহরে কোনো রাজনৈতিক দল সভা, সমাবেশ, মিছিল, পথসভা, পিকেটিং বা এ ধরনের কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে না।
