নেপালে ভয়াবহ বন্যা: প্রাণহানি বেড়ে ৫৫২

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে কেবল নেপালেই নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৫২ জনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার নেপাল পুলিশের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে এএফপি।

এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তিব্বত সীমান্তে অন্তত ৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এতে করে দুই দেশ মিলিয়ে এ দুর্যোগে সর্বমোট প্রাণহানির সংখ্যা ৫৫২ জনে পৌঁছাল।

মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ার পাশাপাশি শত শত বিদেশিসহ ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এটিই নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ। মূলত একটি হিমবাহ ধসে পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও কাদা নিচের দিকে আছড়ে পড়ার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।

এদিকে সীমান্ত পেরিয়ে নেপাল থেকে ভারতে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে অন্তত সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে আজ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। মৃতদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ভারতে উদ্ধার হওয়া এই সাতটি মরদেহ এখন পর্যন্ত মূল নিহতের সংখ্যার (৫৫২ জন) মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এদিকে এই বিপর্যয়ের মধ্যেই নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট একটি হ্রদে আজ নতুন করে পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। এ ঘটনায় ওই অঞ্চলে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা পাহাড়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।

৯৩ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত

হিমালয়ে ভূমিধসে অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে রেড ক্রস। একইসঙ্গে ত্রাণ কর্মকর্তারা নতুন করে বন্যার আশঙ্কা করছেন।

গত বুধবারের বন্যা ও ভূমিধসের কারণে নেপাল ও তিব্বতে নিহতের সংখ্যা এরইমধ্যে ৫৬২ জনের দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে ৫ জন তিব্বতের। স্থানীয় ও বিদেশি মিলিয়ে নিখোঁজ আছে সহস্রাধিক মানুষ। 

শুক্রবার আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিগুলোর ফেডারেশনের প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘আমাদের ধারণা, অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের ব্যাপক সহায়তা প্রয়োজন। তবে আমরা দ্বিতীয় দফার বন্যা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।’

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ফিশার বলেন, ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট একটি হ্রদের বাঁধ ভেঙে পানি উপচে পড়ায় ত্রাণবাহী ট্রাক আটকা পড়ে। এতে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দপ্তরের প্রধান কমল কিশোরও নতুন দুর্যোগের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, এক অর্থে দুর্যোগ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোনো কোনো দিক থেকে এটি এখনও ঘটেই চলেছে।

একই ব্রিফিংয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র তারিক জাসারেভিচ জানান, ভূমিধসে ছয়টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজ হয়েছেন আটজন স্বাস্থ্যকর্মী।

উদ্ধার অভিযানে বিদেশি সহায়তা প্রত্যাখ্যান করছে নেপাল

আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজদের সন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে নেপাল কোনো বিদেশি সহায়তা নিতে চাইছে না। শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘তাদের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই।’ এই দুর্যোগে বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকরা নিখোঁজ হয়েছেন। সেসব দেশের পক্ষ থেকে সহায়তার প্রস্তাব দিলে মন্ত্রণালয় নিজেদের এমন অবস্থান তুলে ধরেছে। 

গত বুধবারের বন্যায় চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুওয়া জেলাসহ বেশ কয়েকটি এলাকা বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের। নিহতের সংখ্যা প্রায় ৫০০ এর কাছাকাছি। 

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজেদের নাগরিক নিখোঁজ থাকায় দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যে নেপালে একটি উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। সিউল বলেছে, তারা ত্রাণবাহী দলও পাঠাতে চায়। তবে শুক্রবার নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। 

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, ‘সহায়তার প্রস্তাব আসা স্বাভাবিক। আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। আপাতত এ ধরনের সহায়তার প্রয়োজন নেই।’ অনীহার কারণ প্রসঙ্গে ছেত্রী বিস্তারিত কিছু বলেননি।

নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত দক্ষিণ কোরিয়ার নয়জন নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কাঠমান্ডু জানিয়েছে, আপাতত বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণের পরিকল্পনা নেই। 

দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল প্রবেশের জন্য নেপাল সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েছে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ। 

বিদেশি দল গ্রহণে নেপাল সরকারের অনীহার কারণ সম্পর্কে ধারণা পেতে দিনেশ ভট্টরাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছে রয়টার্স। তিনি জাতিসংঘে নেপালের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। দিনেশ বলেন, এর সঙ্গে রাসুওয়া জেলার স্পর্শকাতর অবস্থানের সম্পর্ক থাকতে পারে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাটি চীনের তিব্বত অঞ্চলের সীমান্তবর্তী।

দিনেশ ভট্টরাই বলেন, ‘ওই এলাকার স্পর্শকাতর ভৌগোলিক অবস্থানের কথা বিবেচনা করে তারা (সরকার) হয়তো বিদেশি উদ্ধারকারী দল গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তবে লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে চীনের স্পর্শকাতরতার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ, নেপালের নিজস্ব উদ্ধারকারী দলই অভিযান পরিচালনা করছে।

ছেত্রীর বরাত দিয়ে পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। তারা লিখেছে, বন্যার পর শুক্রবার আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে নেপাল। তবে দেশটি আপাতত বিদেশি উদ্ধারকারী দলের সহায়তা ছাড়াই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চাইছে।

এএফপিকে ছেত্রী বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের মূল লক্ষ্য অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান। নেপালের নিরাপত্তা বাহিনী উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সক্ষম। তবে প্রয়োজন হলে সরকার বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা চাইবে।’

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র আরও বলেন, ‘এমন নয় যে আমাদের কোনো সহায়তার প্রয়োজন হবে না। তবে এই মুহূর্তে আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী সক্ষম এবং কার্যকরভাবে কাজ করছে।’

দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অর্থ সহায়তার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তহবিল চেয়ে আবেদন করেছে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ছেত্রী বলেন, একাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নেপালকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ নিয়ে প্রক্রিয়া চলছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *