১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ ৬৩ বিদেশি নাগরিক গ্রেফতার

✍︎ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ✍︎

চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি বাড়ি থেকে ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক গ্রেফতার হয়েছেন।

গ্রেফতার ব্যক্তিরা ওই এলাকার একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাটে দেড় মাস ধরে ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিলেন। তাঁরা অনলাইন প্রতারণার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। এ কাজে তাঁদের সহায়তা করেছে দেশীয় একটি চক্র।

শুক্রবার বিকেলে নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইনসের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মদ। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকা থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানা-পুলিশ।

তাঁদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন, নেপালের ১ জন ও ভিয়েতনামের ১ জন নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের কারও কাছেই পাসপোর্ট ছিল না বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মদ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় অবস্থান করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অন্যান্য অনলাইন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য চক্রটির দেশীয় ও বিদেশি সহযোগী রয়েছে। এসব সহযোগীর মধ্যে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে।

পুলিশ জানায়, গ্রেফতার ব্যক্তিরা ও তাঁদের পলাতক সহযোগীরা পরস্পর যোগসাজশে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ এবং আইনি কর্তৃত্ববহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে অপরাধ করে আসছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

গ্রেফতারের সময় তাঁদের কাছ থেকে ১৩৪টি মুঠোফোন, একটি অ্যাপল ট্যাব, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি সিপিইউ, একটি স্যামসাং মনিটর, একটি কিবোর্ড, একটি মাউস, একটি প্রিন্টার, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাঁচটি পেনড্রাইভ ও চারটি সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান এমপ্লয়মেন্ট কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

ওসি বলেন, ‘৬৩ জনের কারও পাসপোর্ট আমরা পাইনি। একজন বাংলাদেশি তাদের পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছেন। ওই ব্যক্তিকে আমরা খুঁজছি। তাকে পাওয়া গেলে চক্রটির বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে।’

পুলিশ জানিয়েছে, এই অভিযানে পুলিশের পাশাপাশি একাধিক সংস্থা কাজ করেছে।

কী ধরনের প্রতারণা করা হতো, জানতে চাইলে ফয়সাল আহম্মদ বলেন, কখনো নিজেরা ওয়েবসাইট খুলে, আবার কখনো বিভিন্ন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ ছাড়া ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য হ্যাক করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে এসব প্রতারণার সঙ্গে কারা কীভাবে যুক্ত এবং কী পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার শহরের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে ছয় বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন চীনের ও একজন তাইওয়ানের নাগরিক। তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রামু থানায় করা একটি অভিযোগের সূত্র ধরে ঢাকার পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই হোটেলে অভিযান চালানো হয়। পরে ছয়জনের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়। আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

পুলিশ আরও জানিয়েছিল, চীন ও তাইওয়ানের কয়েক শ নাগরিক কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের দুটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক আইফোন কী কাজে ব্যবহার করা হতো এবং এর সঙ্গে অনলাইন প্রতারণার কী সম্পর্ক, সে বিষয়ে তখন বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

কক্সবাজারের ওই ঘটনার সঙ্গে খুলশীর ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মদ বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *