তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১৪৮৭ কোটি টাকা

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎ 

গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। ফলে। এই তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৬ ভিত্তিক শ্রেণিকৃত ঋণ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত ঋণ। অর্থাৎ মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এখন সমস্যাগ্রস্ত। যদিও ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা- যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল। সেই হিসাবে এক প্রান্তিকেই খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা এবং হার বেড়েছে ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এক বছর আগে ২০২৫ সালের মার্চে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে এই হার বেড়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ পয়েন্ট।

বর্তমান পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে ৩২ টাকার বেশি এখন শ্রেণিকৃত। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যে অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ফেরত পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এই অঙ্ক ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার এখন ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। তিন মাস আগে যা ছিল ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। সেই তুলনায় এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।

প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে অধিকাংশই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে চলে গেছে। মার্চ ২০২৬ শেষে মন্দ বা ক্ষতিজনক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। যা মোট শ্রেণিকৃত ঋণের ৯৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ সমস্যাগ্রস্ত ঋণের প্রায় পুরো অংশই এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে আদায় সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। এটি ব্যাংকগুলোর জন্য ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট’ (এসএমএ) বা সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। মার্চ ২০২৬ শেষে এই ধরনের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১২০ কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে যা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে এই খাতে প্রায় ২৮ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাংকগুলোকে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়, যাকে প্রভিশন বলা হয়। মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে সংরক্ষিত আছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত। ফলে এসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের প্রায় ৪৬ টাকাই সমস্যাগ্রস্ত। খেলাপি ঋণের হারও ৪৫ দশমিক ২১ শতাংশ, যা পুরো ব্যাংকিং খাতের গড় হারের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া এসব ব্যাংকের নেট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ।

দেশের ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট ঋণ ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত ঋণ। ফলে শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। তিন মাস আগে এই হার ছিল ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক প্রান্তিকে ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৬ কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণের হার ২৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবস্থান তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। মোট ৬৭ হাজার ৬২৮ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে তাদের শ্রেণিকৃত ঋণ মাত্র ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং খেলাপি ঋণের হার ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। নেট শ্রেণিকৃত ঋণের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ৪৭ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত। ফলে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ। খেলাপি ঋণের হার ৩৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ বেড়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। মোট ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে, ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ১৮ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকে ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকে মাত্র শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *