✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
চলতি বছরের জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কমেছে। তবে, ধর্ষণ ও আত্মহত্যার মতো গুরুতর অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জুলাই ২০২৬ এর নারী, শিশু, মাদক ও অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত সহিংসতার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে জুন ও জুলাই মাসের বিভিন্ন ঘটনার তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ৩২০টি ঘটনার বিপরীতে জুলাইয়ে এ সংখ্যা কমে ৩০৬-এ নেমেছে। জুনে ৬৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও জুলাইয়ে তা বেড়ে ৯০-এ পৌঁছেছে। একইভাবে আত্মহত্যার ঘটনা ১৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৮টি। যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনাও ২১ থেকে বেড়ে ২২টি হয়েছে।
অন্যদিকে, দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৬ থেকে ৭টিতে, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৫ থেকে ৩টিতে, শারীরিক নির্যাতন ৫৬ থেকে ৪২টিতে এবং হত্যার ঘটনা ৭৬ থেকে ৫২টিতে নেমে এসেছে। অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা সামান্য বেড়ে ১২ থেকে ১৩টি হয়েছে, আর অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা দুই মাসেই একটি করে ঘটেছে।
এমএসএফের মতে, এ ধরনের গুরুতর অপরাধ সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত ঘটনায় জুলাই মাসে কোনো নিহত বা আহতের তথ্য না থাকলেও ১০ জনকে আটক করা হয়েছে, যেখানে জুনে কোনো আটক ছিল না। এমএসএফের মতে, এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। তবে অনলাইন জুয়ার বিস্তার তরুণ সমাজের মধ্যে অর্থনৈতিক শোষণ, পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট ও সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ধর্ষণ ও আত্মহত্যার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি
এমএসএফের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, জুলাই মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯০টি। জুনে এই সংখ্যা ছিল ৬৮টি। অর্থাৎ এক মাসে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। জুনে যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির ঘটনা ছিল ২১টি। জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ২২টি।
অন্যদিকে জুনে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল ১৭টি। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮টিতে। এক মাসে আত্মহত্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। এমএসএফ মনে করে, ধর্ষণের মতো ঘটনা বৃদ্ধি নারী ও শিশুদের চরম নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত দেয়। আর আত্মহত্যার উচ্চ হার সামাজিক নিপীড়ন ও বিচারহীনতার মানসিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
কমেছে কিছু অপরাধ
ধর্ষণ ও আত্মহত্যা বাড়লেও নির্যাতনের কিছু সূচক জুলাই মাসে কমেছে। জুলাই মাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭টি, যা জুনে ছিল ১৬টি। জুনে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছিল ৫টি, জুলাইয়ে তা কমে হয়েছে ৩টি। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ৩৫টি থেকে কমে ৩৪টি হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ৫৬টি থেকে কমে ৪২টিতে নেমেছে।
এ ছাড়া জুনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ৭৬ জন নারী ও শিশু, জুলাইয়ে এই সংখ্যা কমে হয়েছে ৫২টি। তবে অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা ১২টি থেকে সামান্য বেড়ে ১৩টি হয়েছে। অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা জুনের মতো জুলাইয়েও একটি ঘটেছে।
সালিসে ফৌজদারি অপরাধ মীমাংসা ও নবজাতক উদ্ধার
আইন অমান্য করে সালিসের মাধ্যমে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ মীমাংসার প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমএসএফ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে ধর্ষণের চেষ্টা ও বলাৎকারের মতো অন্তত তিনটি ঘটনা বেআইনি সালিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল ধর্ষণের চেষ্টা এবং একটি বলাৎকারের ঘটনা।
জুলাই মাসে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১১ জন নবজাতককে উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। তাদের মধ্যে ৮ জন ছিল মৃত, আর ৩ জন জীবিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণত এসব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পুলিশ কার্যকর কোনো তদন্ত করে না। ফলে অপরাধীরা আইনের আওতার বাইরেই থেকে যায়। মৃত নবজাতকের ক্ষেত্রে পুলিশ সাধারণত অপমৃত্যুর মামলা করে। আর জীবিত নবজাতকদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এমএসএফের মতে, বেআইনি সালিস ও নবজাতক পরিত্যাগের ঘটনাগুলো সমাজে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও দৃঢ় করছে।
