এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বে বড় রদবদল

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎ 

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক কমিটিতে রদবদল আনা হয়েছে। ২১৭ সদস্যের কমিটি ১৯৬ সদস্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। আহ্বায়ক পদে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব পদে আখতার হোসেন বহাল থাকলেও বিলুপ্ত করা হয়েছে মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের মতো পদ।

পুনর্গঠিত কমিটিতে কয়েকজন নেতার পদোন্নতি হয়েছে, আবার কয়েকজনের পদাবনতি ঘটেছে। বাদ পড়েছেন আগের কমিটির কয়েকজন নেতা। আগের কমিটিতে মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হয়েছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক। মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) পদ থেকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন হাসনাত আবদুল্লাহ।

মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) পদ থেকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব হয়েছেন সারজিস আলম। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ পেয়েছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিবের দায়িত্ব। পাশাপাশি তাকে এনসিপির মুখপাত্র করা হয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না দিলেও দলটির মূল নেতৃত্বে নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ থাকছেন বলে স্পষ্ট হয়েছে। তারা দলটির রাজনৈতিক পর্ষদেরও সদস্য। এই পর্ষদের তালিকায় প্রথম ছয়টি নাম তাদের।

রাজনৈতিক পর্ষদের অন্য সদস্যরা হলেন-আবদুল্লাহ আল আমিন এমপি, আরিফুল ইসলাম আদীব, ড. আতিক মুজাহিদ এমপি, আবদুল হান্নান মাসউদ এমপি, আলী আহসান জুনায়েদ, সারোয়ার তুষার, আকরাম হুসাইন, সালেহ উদ্দিন সিফাত, মাহমুদা আলম মিতু এমপি ও নুসরাত তাবাসসুম এমপি।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন জানিয়েছেন, পুনর্গঠিত কমিটির মাধ্যমে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। সারা দেশে জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের কাজ চলছে। এসব কমিটি গঠনের কাজ শেষ হলে কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচনের জন্য সম্মেলন আয়োজন করা হবে। সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব দায়িত্ব নেবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সদস্য সচিব ছিলেন আখতার হোসেন। পরের বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ ছেড়ে এই সংগঠনে যোগ দেন নাহিদ ইসলাম। এর তিন দিন পর জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি নামে নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৭১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে এনসিপি। ওই কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ছিলেন তাসনিম জারা ও নাহিদা সারোয়ার নিভা। পরবর্তী সময়ে কমিটির সদস্যসংখ্যা বেড়ে ২১৭ হয়।

গত বছরের ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্তের পর এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন তাসনিম জারা। একই সময়ে তাজনুভা জাবিনসহ আরও ১২-১৩ জন পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ না করলেও দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন সামান্তা শারমিন, নাহিদা সারোয়ার নিভা ও নুসরাত তাবাসসুমসহ কয়েকজন নেতা। পরে নুসরাত তাবাসসুম আবার সক্রিয় হন এবং এনসিপির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

পুনর্গঠিত কমিটিতে সামান্তা শারমিন বাদ না পড়লেও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। নাহিদা সারোয়ার নিভাকে রাখা হয়েছে যুগ্ম সদস্য সচিব পদে। তবে তাদের কাউকেই রাজনৈতিক পর্ষদে রাখা হয়নি। অন্যদিকে, আগের কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব যুগ্ম আহ্বায়ক পদের পাশাপাশি রাজনৈতিক পর্ষদেও রয়েছেন।

আগের কমিটিতে থাকা সালমান জাবেদ, রফিকুল ইসলাম কনকসহ কয়েকজন নতুন কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন।

কমিটিতে নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব
পুনর্গঠিত কমিটিতে ১৯ জন নারী রয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন রাজনৈতিক পর্ষদে স্থান পেয়েছেন। ২৪ জন যুগ্ম আহ্বায়কের মধ্যে ছয়জন নারী। এ ছাড়া ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাঁচজন প্রতিনিধি রয়েছেন নতুন কমিটিতে।

রাজনৈতিক পর্ষদের বাইরে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রয়েছেন মনিরা শারমিন, ব্যারিস্টার সানি আব্দুল হক, মাহবুব আলম, মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন, আশরাফ মাহাদী, সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া, জাবেদ রাসিন, এহতেশাম হক, দিলশানা পারুল, প্রীতম দাশ, সামান্তা শারমিন, ইসহাক সরকার, তারেক এ আদেল ও এ কে ফ্লোরা।

যুগ্ম সদস্য সচিব পদে দায়িত্ব পেয়েছেন আলাউদ্দীন মোহাম্মদ (আন্তর্জাতিক), এস এম সাইফ মুস্তাফিজ (কোষাধ্যক্ষ), মো. নিজাম উদ্দিন, নাহিদা সারোয়ার নিভা, ফরিদুল হক ও মো. আতাউল্লাহ।

১০ সাংগঠনিক অঞ্চলে দায়িত্ব বণ্টন
দেশের ৬৪টি জেলাকে ১০টি সাংগঠনিক অঞ্চলে ভাগ করে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা হলেন—ঢাকা উত্তর বিভাগে সাইফুল্লাহ হায়দার, চট্টগ্রাম দক্ষিণে এ এস এম সুজাউদ্দীন, রাজশাহীতে ইমরান ইমন, চট্টগ্রাম উত্তরে নাভিদ নওরোজ শাহ, রংপুরে ডা. মো. কামরুল ইসলাম দর্পণ, সিলেটে প্রকৌশলী কামরুল আরিফ, খুলনায় শাহরিন ইরা, বরিশালে ড. শামীম হামিদী, ময়মনসিংহে মিয়াজ মেহরাব তালুকদার এবং ঢাকা দক্ষিণে আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের নিয়ে গঠিত বিদেশ শাখার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন রাফে সালমান রিফাত। প্রচার সম্পাদক হয়েছেন জয়নাল আবেদিন শিশির এবং মিডিয়া সম্পাদক হয়েছেন ইয়াসির আরাফাত

চার নেতার পদোন্নতি

নতুন কমিটিতে আগের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এবং মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া হয়েছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব।

আগের কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা পেয়েছেন যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্ব।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে এই পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

বিলুপ্ত সাতটি পদ

কমিটি পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো থেকে সাতটি পদ বাদ পড়েছে। এগুলো হলো মুখ্য সমন্বয়ক, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক, মুখপাত্র, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক, সংগঠক ও যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক।

আগের কমিটিতে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক পদে ৪২ জন এবং যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক পদে ২৩ জন দায়িত্ব পালন করতেন। নতুন কাঠামোয় এসব পদ না থাকায় দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তন এসেছে।

তবে পুনর্গঠিত কমিটিতেও দুজন করে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব রাখা হয়েছে। নতুন কমিটিতে ২৪ জন যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ছয়জন যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।

যুক্ত হয়েছে ৩২টি সম্পাদকীয় পদ

আগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সম্পাদকীয় পদ ছিল না। নতুন কমিটিতে ৩২টি সম্পাদকীয় পদ সৃষ্টি করে ৩২ জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে এক বা দুজন করে সহসম্পাদকও রয়েছেন।

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ২১৭ সদস্যের কমিটি নিয়ে যাত্রা শুরু করে এনসিপি। পরে বিভিন্ন সময়ে কমিটিতে সংযোজন-বিয়োজন হয়। এবার পুনর্গঠিত কমিটিতে নতুন মুখও যুক্ত হয়েছেন।

গত এপ্রিলে এনসিপিতে যোগ দেওয়া অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি এ কে ফ্লোরা এবং বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন। ইসহাক সরকার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপিরও আহ্বায়ক। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির সাবেক উপদেষ্টা তারেক এ আদেলকেও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে।

শীর্ষ নেতৃত্বে সংসদ সদস্যরা

পুনর্গঠিত কমিটির শীর্ষ ছয় নেতার মধ্যে রয়েছেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তারা দলের আট সংসদ সদস্যের মধ্যে তিনজন।

অন্য পাঁচ সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিকুর রহমান মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ, মাহমুদা আলম মিতু ও নুসরাত তাবাসসুম যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন।

আগের কমিটির ১১টি শীর্ষ পদকে দলটির নেতৃত্বের ‘সুপার ইলেভেন’ বলা হতো। পুনর্গঠনের পর শীর্ষ নেতৃত্বের কাঠামো ‘সুপার সিক্সে’ রূপ নিয়েছে। তবে দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের ১৬ সদস্যকে ‘সুপার সিক্সটিন’ হিসেবে অভিহিত করছে এনসিপি।

শীর্ষ ছয় নেতার বাইরে রাজনৈতিক পর্ষদের অন্য ১০ সদস্য হলেন আবদুল্লাহ আল আমিন, আরিফুল ইসলাম আদীব, আতিকুর রহমান মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ, আলী আহসান জুনায়েদ, সারোয়ার তুষার, আকরাম হুসাইন, সালেহউদ্দিন সিফাত, মাহমুদা আলম মিতু ও নুসরাত তাবাসসুম।

দল গঠনের পর থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, নির্বাচন ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুতে কয়েকজন নেতার ভূমিকা এনসিপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বে তাদের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। নতুন কমিটিতে পদোন্নতি ও সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দলটি নেতৃত্বের দায়িত্ব বণ্টন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *