✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
বিএনপি সরকার গুম নিয়ে এমন আইন আনতে চায় যাতে প্রতিটি ভিকটিম বিচার পায় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত প্রদর্শনী ও আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬’ সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে গুমের শিকার ব্যক্তিরা যাতে সরাসরি আদালতে যেতে পারেন এবং দায়ীদের বিচার হয়, সেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা এমন আইন আনতে চাই, যাতে প্রত্যেকটা ভিকটিম তাঁর প্রতিকার পাবে, আদালতে যেতে পারবে এবং তার বিচার পাবে এবং যারা দায়ী তারা সাজা পাবে।’
গুমের বিভিন্ন ধরন, সংশ্লিষ্ট অপরাধের সাজা এবং তদন্তের পদ্ধতিও আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া গুমের শিকার কোনো ব্যক্তিকে পাওয়া না গেলে তাঁর ওয়ারিশদের সম্পত্তির অধিকার এবং পরিবারের জীবনযাপনের বিষয়েও আইনে বিধান রাখা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যারা গুম করেছে, দায়ী তারা যদি ক্ষতিপূরণ দিতে না পারে, সেই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে দেওয়ার জন্যও আমরা সেখানে বিধান রেখেছি।’
গুমবিরোধী আইনটি ভবিষ্যতেও কার্যকর থাকবে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা আজকে সরকারে আছি, আগামীতে তো নাও থাকতে পারি। কিন্তু এই আইনটা থাকবে। এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের শিকার যেই হোক, সে বিচার পাবে।’
নিজের ৬১ দিনের গুমের অভিজ্ঞতা স্মরণ
নিজের ৬১ দিনের গুমের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমার গুমের ৬১ দিন—তার যতটা মিনিট, যতটা মুহূর্ত কেটেছে, তার প্রত্যেকটা যদি আমি লিখে রাখতে পারতাম, তাহলে জাদুঘরের সংকলন হতো কোনো কিতাব। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতো যে আগামী ভোর কি আমি দেখব?’
আজ শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনায় নিজের গুমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
গুমের সময় দিন-রাতের হিসাব রাখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সকালের নাশতা দেওয়া হলে বুঝতেন সকাল হয়েছে। আর নখের দাগ দিয়ে দেয়ালে সংখ্যা লিখে লিখে দিন গুনতেন।
বন্দী অবস্থায় নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, তাঁর হার্টে স্টেন্টিং এবং কিডনিসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা ছিল। ইন্টারোগেশনের সময় নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। সে সময় তাঁর মৃত্যু হলে লাশ যেন পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয় সেই অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
ছোট কক্ষে ৬১ দিন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তাঁকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল, সেটি ছিল অত্যন্ত ছোট। তাঁর ভাষ্য, কক্ষটি আনুমানিক পাঁচ ফুট বাই ১০ ফুটের মতো ছিল। সেখানে একটি কম্বল ও পাতলা একটি বালিশ ছাড়া তেমন কোনো সুবিধা ছিল না।
কক্ষের এক কোণে প্রস্রাব-পায়খানার ব্যবস্থা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখান থেকে দুর্গন্ধ আসত। ওই পরিবেশে ঘুমাতেও তাঁর সমস্যা হতো বলে জানান তিনি।
একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতাও বর্ণনা করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, তাঁকে যখন খাবার দিতে আসা হয়, তখন কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা খুলে দেখা হয় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
সালাহউদ্দিনের ভাষ্য, বুকে ব্যথা হচ্ছে জানানোয় তাঁকে বলা হয়েছিল—এখানে ডাক্তার আসা নিষেধ এবং তাঁকে নিজে নিজে সুস্থ থাকার চেষ্টা করতে হবে।
শিলংয়ে ‘আপনি এখন মুক্ত’
গুমের পর তাঁকে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় গাড়িতে করে নেওয়ার পর তাঁকে একটি নির্জন এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেখানে তাঁকে ফুটপাতে দাঁড় করিয়ে রেখে বলা হয়েছিল ‘ইউ আর ফ্রি নাউ।’ পরে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তিনি পুলিশকে খবর দেওয়ার অনুরোধ করেন। পুলিশ এসে তাঁকে একটি বিট হাউসে নিয়ে যায় এবং পরে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
‘আমি জানতাম তুমি বেঁচে আছো’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের সহায়তায় দেওয়া ফোন নম্বরের মাধ্যমে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রী বিদেশি নম্বর থেকে আসা কলটি ব্যাক করেন। ফোনে ‘হ্যালো’ বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্ত্রী চিৎকার করে বলেন, ‘আমি জানতাম তুমি বেঁচে আছো।’
এরপর পরিবারের সদস্যদের শিলংয়ে আসার ব্যবস্থা করতে বলেন তিনি। ওই সময় সেখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকায় স্ত্রীকে গরম কাপড় নিয়ে আসতেও বলেছিলেন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে হাস্যরস না করার আহ্বান জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘গুম হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে আন্ডারমাইনিং করার একটা প্রবণতা আমরা গত দুই বছর দেখছি। এটা অনেকটা অপকালচারে পরিণত হচ্ছে।’
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমি বেঁচে আছি, হুম্মাম বেঁচে আছে, আরমান বেঁচে আছে। আমরা কি জানতাম আমরা বেঁচে থাকব? বেঁচে থাকাটাকে নিয়ে হাস্যরস করা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে হতাশাগ্রস্ত করবে।’
গুমের মতো অভিজ্ঞতার শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে উপহাস না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এতে তাঁদের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে খাটো করা হয়।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান, সানজিদা ইসলাম তুলি, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনসহ গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা।
