✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
জননিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় র্যাবকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, একটি নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলছে, যার মাধ্যমে এই বাহিনীর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কাজের পরিধি সুনির্দিষ্ট করা হবে।
সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর কুর্মিটোলায় র্যাব সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভার আয়োজন করে সংস্থাটি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘র্যাবের কিছু কর্মকর্তার কারণে প্রতিষ্ঠান হিসেবে র্যাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না যা ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সেটা পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি সবাই প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, কয়েকজন কর্মকর্তার ‘অ্যাক্টিভিটিসের’ জন্য পুরো প্রতিষ্ঠান দায়-দায়িত্ব নিতে পারে না।’
তিনি বলেন, “আমরা এখন যার যার নিজস্ব আইনে সেই সমস্ত কর্মকর্তাদের ‘অ্যাকাউন্টেবল’ করার জন্য এবং বিচারের আওতায় নিয়ে আসার জন্য ইতোমধ্যে অনুশাসন দিয়েছি। কারণ প্রতিষ্ঠান দায়ী না, আইন আছে প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে এবং কর্মকর্তারা কীভাবে চলবে- সেটা আইন মাফিক পরিচালিত হবে। যদি কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী বিপদগ্রস্ত হয় বা বিপথে যায়, তারা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান দায়ী না।”
র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্রের এমন কোনো সংস্থা বাহিনী ছিল না যারা ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু কর্মকর্তার জন্য র্যাব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। তাদের বিষয়ে যার যার সংস্থার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া অনুশাসন দেওয়া হয়েছে। যখন আমেরিকা অনুশাসন দিয়েছিল, তখন র্যাবের কিছু কর্মকর্তা এমন কিছু কার্যক্রম করেছিল, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত ছিল, যা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করেছিল।
আগের মতো র্যাব রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্নের সুরে বলেন, ‘গত তিন মাসে কি অন্য কোনো বাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে? পুলিশ ব্যবহৃত হয়েছে? সুতরাং মর্নিং শোজ দ্য ডে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমেরিকা র্যাবের ওপর যে ‘স্যাংশন’ ‘ইম্পোজ’ করেছিল, সেই সময় র্যাব রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদী সরকারের শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য এবং একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমরা যদি ‘এলিট ফোর্স’ হিসেবে একটা নতুন ‘ফোর্স রিনেমড’ করি বা ‘রেইজ’ করি, সেখানে হয়তো তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। বর্তমানে র্যাব যে আইনে পরিচালিত হচ্ছে সেটা আর্ম পুলিশ ব্যাটালিয়নের একটা ‘সার্টেন প্রভিশনের’ ওপর ভিত্তি করে ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে চলছে, যা সঠিক ছিল না।”
তিনি বলেন, “এখন আমরা আলাদা ‘এলিট ফোর্সের’ জন্য নতুন আইন করব, যেখানে তাদের অথরিটি, রেসপন্সিবিলিটি, জবাবদিহি, অ্যাকাউন্টেবিলিটি এবং ট্রান্সপারেন্সি নিশ্চিত করা হবে। একটা বাহিনী রেইজ হয়েছে, তার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন থাকতে হবে এবং তাদের দায়িত্ব বণ্টন করা থাকবে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটা এলিট ফোর্স অবশ্যই দরকার। তাদের ইকুইপমেন্টস, লজিস্টিকস, ট্রেনিং ফ্যাসিলিটিস ও অ্যাসেটস সবকিছু সেখানে থাকবে। নতুন এই বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হবে না।”
স্ংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “গত তিন মাসে র্যাব বা পুলিশকে কি পলিটিক্যাল উদ্দেশে ব্যবহার করা হয়েছে? সুতরাং ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। এছাড়া, ইলিয়াস আলীর স্ত্রী আইসিটি কোর্টে মামলা করেছেন এবং আমিও মামলা করেছি। আইসিটি আইনের মধ্যে যদি প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা যায়, তবে সব ধরনের গুমের বিচার সেখানে করা সম্ভব হবে।”
র্যাবের জন্য নতুন সরঞ্জাম কিনতে বরাদ্দ, আলাদা প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের বিষয়েও আলোচনায় রয়েছে। র্যাবের জন্য প্রায় ১২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬৩টি গাড়ি কেনারও অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
একই সঙ্গে র্যাবের অপারেশনাল কার্যক্রমে নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আলাদা আইনের খসড়া করা হয়েছে। সরকার চায়, একটি সুনির্দিষ্ট আইনের আওতায় র্যাব পরিচালিত হবে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি এলিট ফোর্স প্রয়োজন রয়েছে। এত দিন র্যাবের কোনো স্বতন্ত্র আইন ছিল না। যেমন ইচ্ছা তেমন চলেছে। এখন আমরা র্যাবকে আইনের আওতায় আনতে চাই। এ বিষয়ে একটি খসড়াও তৈরি করা হয়েছে।’
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ আটটি বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে র্যাব গঠিত হয়। সংঘবদ্ধ অপরাধ ও জঙ্গিবাদ দমনে দ্রুত অভিযানের কারণে শুরুতে র্যাব প্রশংসিত হয়। বর্তমানে সারা দেশে র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন রয়েছে। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে র্যাবের বিরুদ্ধে। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাহিনীটির কর্মকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ জানাতে থাকে। বিশেষ করে ২০১১-২০১৬ সালের মধ্যে কয়েকটি আলোচিত গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে র্যাব তীব্র সমালোচিত হয়।
পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনেও ধারাবাহিকভাবে বাহিনীটির বিরুদ্ধে উদ্বেগ জানানো হয়। সবশেষ ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক ও তৎকালীন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওই সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ওই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিল, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে র্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে র্যাব বিলুপ্তির আলোচনা আরও জোরালো হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব বিলুপ্তির দাবি তুলেছিল নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুম কমিশন র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে র্যাবের দৃশ্যমান অভিযান কমিয়ে পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে যৌথ অভিযান বাড়ানো হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপির সরকার। বর্তমান সরকার র্যাবকে আরও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা বাড়াতে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে দুটি নতুন প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর একটি হবে পুলিশের জন্য, অন্যটি র্যাবের জন্য। একই সঙ্গে র্যাবের জন্য ১৬৩টি গাড়ি কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এসব গাড়ি কিনতে ব্যয় হবে প্রায় ১২২ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, র্যাবের জন্য নতুন আইনের খসড়ায় সংবিধান, বিদ্যমান ফৌজদারি আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি রাখা হয়েছে। প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম, নিয়োগ, পদায়ন, শৃঙ্খলা ও তদারকি—সবই এই আইনের আওতায় পরিচালিত হবে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার, তদন্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ক্ষমতাও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে।
র্যাবের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি বিশেষায়িত এলিট ফোর্সের প্রয়োজন রয়েছে।
র্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘র্যাব বিলুপ্তি বা পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত সরকারের বিষয়। এ ক্ষেত্রে বাহিনীটির নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই, র্যাব একটি পেশাদার, মানবিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্থা হিসেবে গড়ে উঠুক। ভবিষ্যতে র্যাব অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারবে।’
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুম কমিশনের সিনিয়র সদস্য ছিলেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সরকার যদি র্যাব বহাল রাখতে চায়, তাহলে নতুনভাবে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে পরিচালনা করা উচিত। তাঁর মতে, র্যাবে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের সংমিশ্রণ থাকা সমীচীন নয়। এই তিন বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার করে শুধু পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে র্যাব পরিচালনা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আইন ও বিধিমালার আওতায় পরিচালিত একটি পেশাদার ইউনিটই জনগণের আস্থা অর্জনে বেশি কার্যকর হবে।
