✍︎ এম ওবায়দুর রহমান ✍︎
মায়ের মুখে শুনেছি, শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে খ্যাতিমান অভিনেত্রী আয়েশা আখতার যখন তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে যোগ দেন, তখন আমাদের গোটা এলাকায় একটা রিরি পড়ে যায়। তখনকার পশ্চাৎপদ সমাজ তাঁর এহেন কাজকে এক মহা-কেলেঙ্কারী ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে পারেনি। এ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় তখনকার সময়ে একজন আত্মমর্যাদাশীল ও সাহসী নারী নিজেকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠার জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন।
একটি ঘটনা বললে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। আমাদের উল্টোদিকের পাড়ায় বিয়ে হয়েছিল আয়েশা আখতারের এক ভাতিজির। তিনি আমার সম্পর্কে জেঠি। আমার মায়ের সাথে ছিল তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক; অনেকটা গলায় গলায় ভাব বলা যায়। জেঠি বেশ নরম-কোমল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কিন্তু গ্রামীণ সমাজে এ বাড়ি ও বাড়িতে নানা বিষয়ে টুকটাক ঝগড়াঝাটি অস্বাভাবিক নয়। তো, এই জেঠির সাথে যখন পড়শি মহিলাদের কথা কাটাকাটি হতো এবং অনেকে যখন তাঁর সম্ভ্রান্ত বাপের বাড়ির খবরটি জানতো, তখন আর খুব একটা যুত করতে পারতো না। আর তখনই প্রতিপক্ষ মোক্ষম অস্ত্রটি ছুঁড়ে মারতো ‘অত ভালা দেইখ্যাই-তো ফুপু রেডু সেন্টারঅ গেছে।’ তখন আমার সেই জেঠিমা একদম চুপ মেরে যেতেন। আর কোনো কথাই তাঁর মুখে উঠতো না।
শ্রদ্ধেয় আয়েশা আখতারের সাথে চেনাপরিচয় আমার উপস্থাপক জীবনের শুরুর দিকেই ১৯৯৬ কি ১৯৯৭ সালে। তখন তিনি বেতারের জাতীয় অনুষ্ঠান ‘আমার দেশ’ করতে বিকেল দিকটায় আগারগাঁও স্টেশনে আসতেন। প্রথম পরিচয়েই এলাকার ছেলে হিসাবে তিনি আমায় আপন করে নেন। আমি মুগ্ধ হয়ে যাই তাঁর আন্তরিক ব্যবহারে। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, যখনই দেখা হতো, সালাম দেওয়ার সাথে সাথেই মনোহরদীর আঞ্চলিক উচ্চারণে বলে উঠতেন, ‘অ্যায় উবাইদুর কেমুন আছত? বাইত যাসটাস নাকি-আমার মানিকের লগে তর দ্যাহা অয়?’ এমন আরও কত কথা-কত গল্প। মানিক তাঁর এক পুত্র যিনি গ্রামে থাকতেন। একবার মাত্র এলাকার একটি অনুষ্ঠানে তাঁর সাথে আমার আলাপ-পরিচয় হয়েছিল। আমার নামটিও তিনি প্রিয় সাগরদীর মানুষদের মতো ‘উবাইদুর’ বলতেন। কখনো ওবায়েদ বলতেন না(নাগরিক জীবনে আমি ওবায়েদ নামে পরিচিত)। একমাত্র এই মহীয়সী নারীর সাথে কথা বললেই আমার গ্রামীন জীবনের স্বাদটি পুরো মাত্রায় পেতাম।
আয়েশা আখতারের জন্ম আমার বাড়ি থেকে মাইল দেড়েকের মাথায় চক তাতারদী গ্রামে ১৯৩১ সালের ১ জানুয়ারি। তাঁর জন্মস্থানটি বর্তমান নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। যতদূর জানা যায়, এসএসসি পাশের পর আয়েশা আখতার এলাকার একটি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই শিল্পী মনের অধিকারী এই মানুষটি কী এক দুর্নিবার আকর্ষণে ছুটে যান তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা স্টেশনে। আর ষাটের দশকের শুরুতে এই রেডিও-ই তাঁকে এনে দেয় আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও সম্মান। আইয়ুব শাসনামলে বেতারের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘বুনিয়াদি গণতন্ত্রের আসর-এ তাঁর ‘মজিদের মা’ নামটি তখন মানুষের মুখে মুখে। সত্তর দশকের শুরুতে সিনেমায় যোগ দেবার আগ পর্যন্ত এই নামেই বহুবছর তিনি পরিচিত ছিলেন। বলা যায়, মজিদের মা’র দোর্দন্ড প্রতাপের কাছে হেরে যায় তাঁর পিতৃদত্ত আয়েশা আখতার নামটি। এ অনুষ্ঠানটি স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ‘আমার দেশ’ নামে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। আয়েশা আখতার দীর্ঘকাল বাংলাদেশ বেতারে স্টাফআর্টিস্ট হিসাবে চাকরিরত ছিলেন।
সত্তর দশকের শুরুর দিকে আয়েশা আখতার তাঁর বর্ণাঢ্য চলচ্চিত্র জীবন শুরু করেন। একনাগাড়ে অভিনয় করতে থাকেন- আসিয়া, লালন ফকির, ঝড়ের পাখি, সংগ্রাম, জানোয়ার, ওয়াদা, নয়নমনি, অমর প্রেম, তুফান, অলংকার, দিন যায় কথা থাকে, জীবন নৌকা, মানসী, সওদাগর, দুই পয়সার আলতা, আলী আসমা, নতুন বউ, জাদু মহল, জীবন ধারা, মায়ের দোয়া, ভাই ভাই, সেলিম জাভেদ, রাজা সাহেব, ভাঙ্গাগড়া, স্বামীর ঘর, জবাব, চাষীর মেয়ে, সেতু, নোলক, অলংকার, অনুরাগ, মাটির ঘর, বন্দুক, ঈমান, দি ফাদার, বৌরানী, সংঘর্ষ, বাদল, সুলতানা ডাকু, সাক্ষী, জন্ম থেকে জ্বলছি, ভাঙাগড়া, স্বামীর ঘর, গাঁয়ের ছেলে, মাটির কোলে, ভাগ্যলিপি, নওজোয়ান, শুভরাত্রি, সানাই , আশার আলো, নতুন বউ, রজনীগন্ধা, বৌ মা, এই নিয়ে সংসার, নরম গরম, নদীর নাম মধুমতী, সিপাহীসহ বহুসংখ্যক ছবিতে। প্রতিটি ছবিতে মমতাময়ী মা বা অন্য যেকোনো নারী চরিত্রে এক অপরিহার্য অভিনেত্রী হয়ে উঠেন তিনি। তাঁর অনবদ্য ও দরদমাখা অভিনয়শৈলী মুগ্ধ ও মোহিত করে এদেশের আপামর সিনেমাপ্রেমী মানুষকে।
আয়েশা আখতার ১৯৮২ সালে ‘রজনীগন্ধা’ ছবিতে অভিনয় করে, পার্শ্ব চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
আয়েশা আখতারের পুত্র আফতাব আহমেদ বেতার-টেলিভিশনের একজন খ্যাতিমান ইংরেজি সংবাদ পাঠক ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বর্ণাঢ্য শিল্পী-জীবনের অধিকারী আয়েশা আখতারের জীবনাবসান ঘটে ২০০৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী।
তাঁর অম্লান স্মৃতির উদ্দেশে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও অতল ভালবাসা।
লেখক: উপস্থাপক, ঘোষক, সংবাদ পাঠক
