সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ধার

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহক মোট ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেন। অর্থ ফেরত দেওয়ার সুবিধার জন্য টাকা ছাপিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে রোববার পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। ব্যাংকগুলো হলো— এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চার ব্যাংকের কতৃর্ত্ব ছিল চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদের।

ব্যাংকগুলোকে এর আগে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪৭ হাজার ৮৪ কোটি টাকার বিশেষ ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সুদসহ যা এখন প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে নতুন করে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতিতে এর যে প্রভাব পড়বে তা মেনেই ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা আনতে এটা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়া বা তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।

পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। এর বাইরে আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পুরো অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্কিম ঘোষণা করেছে। ওই স্কিমের বাইরে ব্যক্তি আমানতকারীদের থেকে আবেদন নিয়ে অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।

২৫ আগস্ট সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরতে কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ থাকছে না এমন ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী আমানতের মূল অর্থ তুলতে পারবেন বলেও জানানো হয়। এরপর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক অর্থ ফেরতের বিশেষ উদ্যোগ নেয়। গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট শাখা বা উপশাখায় গিয়ে আবেদন করতে হয়েছে। আবেদন যাচাই করে পাওনা অর্থ পরিশোধ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ও মেয়াদি আমানতের মূল টাকা উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। তবে এই সুবিধার আওতায় আমানতের বিপরীতে অর্জিত বা প্রাপ্য মুনাফা পাওয়া যাবে না। কোনো গ্রাহক মেয়াদি আমানতের মূল টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতের ক্ষেত্রে সেটিকে পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। হিসাব চালু রাখলে চুক্তি অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে মুনাফা দেওয়া হবে।

এদিকে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে আবেদন শুরুর পর রোববার পর্যন্ত ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় জমা টাকা তোলার আবেদন জমা পড়েছে ৭৪ হাজার ২২১টি। সেই হিসাবে মাত্র চার কার্যদিবসে জমা পড়া এসব আবেদনের বিপরীতে মোট টাকার চাহিদা রয়েছে ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।

যাচাই-বাছাই শেষে সোমবার থেকে আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ শুরু করার কথা রয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের।

ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত দুই শ্রেণির আমানতকারীরা টাকা তোলার আবেদন করেছেন। যাঁদের চিকিৎসাসহ খুব জরুরি প্রয়োজন আর যাঁরা ব্যাংকটিতে আস্থা রাখতে পারছেন না। কেবল তাঁরাই মুনাফা ছাড়া মূল টাকা তোলার আবেদন করেছেন। আর সবচেয়ে বড় অংশের লোকজন ব্যাংক থেকে টাকা তুলছেন না। তাঁরা ব্যাংকটিতে আস্থা রাখতে চাচ্ছেন। এটিই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মূল আস্থার জায়গা।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিনে গত মঙ্গলবার আবেদন জমা পড়েছে ১৮ হাজার ৪৬টি, যার বিপরীতে অর্থের চাহিদা দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। দ্বিতীয় দিনে (বুধবার) আবেদন জমা পড়েছে ১৯ হাজার ৬১৩টি, যার বিপরীতে অর্থের চাহিদার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা। তৃতীয় দিনে (বৃহস্পতিবার) আবেদন জমা পড়েছে ২১ হাজার ৮৬টি, এর বিপরীতে অর্থের পরিমাণ ছিল ৯২৩ কোটি টাকা। আর আজ শেষ দিনে আবেদন জমা পড়ে মাত্র ১৫ হাজার ৪৭৬টি, যার বিপরীতে অর্থের চাহিদা রয়েছে ৬৫৭ কোটি টাকা।

তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে চার কার্যদিবসে ব্যাংকটিতে মোট ৭৪ হাজার ২২১টি আবেদন জমা পড়েছে; যার বিপরীতে অর্থের চাহিদা রয়েছে ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীরা তাঁদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ও মেয়াদি আমানতের মূল টাকা উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। তবে এই সুবিধার আওতায় আমানতের বিপরীতে অর্জিত বা প্রাপ্য মুনাফা পাওয়া যাবে না। কোনো গ্রাহক মূল টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতের ক্ষেত্রে সেটিকে পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, যেসব গ্রাহক এখনই আমানত তুলবেন না, তাঁরা হিসাব চালু রাখলে চুক্তি অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

সামগ্রিক বিষয়ে গতকাল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবেদুর রহমান সিকদার এক লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘৮৪ লাখ গ্রাহকের মধ্যে মাত্র ৭৪ হাজার ২২১ জন অর্থ উত্তোলনের আবেদন করেছেন। যাঁরা একবারে পুরো আসল টাকা তুলে নেওয়ার আবেদন করেছেন। এই সংখ্যা মোট আমানতকারীর তুলনায় খুবই কম। তাতে বোঝা যাচ্ছে, এখনো মানুষের যথেষ্ট আস্থা আছে আমাদের ওপর।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *