তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান একটি ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। 

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের পথকে ত্বরান্বিত করতেই এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিটি কার্যকর করা হয়েছে।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই কৌশলগত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। 

এর আগে তুর্কি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে এই তিন দেশের শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা অঞ্চলে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী এই তিন দেশের আত্মপ্রকাশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই চুক্তির মাধ্যমে ন্যাটো জোটের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তির অধিকারী দেশ তুরস্ক, উপসাগরীয় অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি সৌদি আরব এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইরান ও তার মিত্ররা সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। একই সঙ্গে তারা এসব দেশের জ্বালানি রপ্তানির পথও অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করছে।

চুক্তি সইয়ের পর তিন দেশ যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, যেকোনো ধরনের আগ্রাসন প্রতিহত করতে সম্মিলিত প্রতিরোধের সক্ষমতা জোরদার করাই এই চুক্তির উদ্দেশ্য। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। এর আওতায় প্রতিটি দেশ কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বা দায়িত্ব নিয়েছে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি। এতে বলা হয়েছে, সম্মিলিত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অঞ্চল ও এর বাইরে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

তুরস্কের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘চুক্তিতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার একটি ধারা রয়েছে। এটি পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক। এতে শুধু আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহায়তার অঙ্গীকার করা হয়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই কর্মকর্তা জানান, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা পক্ষকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের এতে যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এটি বিদ্যমান কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি বাতিল বা প্রতিস্থাপন করে না।

চুক্তিতে সইকারী তিন দেশের আরেকটি সাধারণ অবস্থান হলো—তারা ইসরায়েল ও বিপ্লবী শিয়া রাষ্ট্র ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী সামরিক অবস্থান নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। এমন এক সময়ে এই চুক্তি করা হলো, যখন তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

সৌদিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গালফ রিসার্চ সেন্টার’-এর চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, এই সম্মেলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা থাকলেও সাম্প্রতিক আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণে রিয়াদ এখন নতুন ও বিশ্বস্ত মিত্রদের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগ দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রাগার এই চুক্তির আওতায় পড়বে না, কারণ তাদের পারমাণবিক প্রতিরক্ষার মূল লক্ষ্য ভারতের দিকেই নিবন্ধিত।

এদিকে, এই তিনটি দেশের মধ্যে আগে থেকেই দ্বিপক্ষীয় সামরিক যোগাযোগ বিদ্যমান। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সৌদি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে, অন্যদিকে তুরস্ক থেকে ড্রোন ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে সৌদি আরব।

ত্রিদেশীয় এই চুক্তির মাধ্যমে দেশগুলোর মধ্যে সামরিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান ও কৌশলগত সমন্বয় আরও জোরদার হবে। দেশ তিনটির চলমান উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান সংঘাত মোকাবিলায় যৌথ নিরাপত্তাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *