পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি মুলতবি

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎  

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে অবৈধ করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি আগামীকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি করেছেন আপিল বিভাগ।

সোমবার (৬ জুলাই)  প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যে আপিল বেঞ্চে এ শুনানি হয়েছে।

এদিন শুনানিতে অংশ নিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল, আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া ও শিশির মনির।

শুনানি শেষে আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, শরীফ ভূইঁয়া আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এর ফলে পরপর তিনটি ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়। এতে করে দেশে একটা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকের কথা বলার স্বাধীনতা ও সংবিধান বিষয়ে আলোচনা করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়াসহ মৌলিক অধিকার গুরুতরভাবে খর্ব করা হয়েছে। এই সংশোধনী যে প্রক্রিয়ায় পাস হয়েছিল, তা ক্রটিপূর্ণ ছিল, এটার মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ধ্বংস করে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা চালু করা হয়। দেশে কার্যত একটা একদলীয় শাসনব্যবস্থা তৈরি করার জন্য এই সংশোধনীটা করা হয়। কাজেই এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সাথে একধরনের প্রতারণা করা হয়েছে। এ কারনে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হওয়া উচিত।

আপিল বিভাগ দ্রুততম সময়ে আপিলগুলোর শুনানি করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন বলে জানান জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূইঁয়া। তিনি বলেন, বর্তমানে চার সদস্যের আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হয়েছে। বেঞ্চের একজন বিচারপতি ১৪ জুলাই অবসরে যাবেন। এর মধ্যে শুনানি শেষে রায় হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আশা করছি জুলাইয়ের মধ্যেই এর শুনানি শেষ হবে এবং আপিল বিভাগ থেকে একটি চূড়ান্ত রায় পাওয়া যাবে। আগের রায়টি হাইকোর্ট বিভাগের ছিল, তবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে এ চূড়ান্ত নিষ্পত্তির প্রয়োজন ছিল। আমাদের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার শুনানি শেষ করব। তবে সরকারসহ আরও অনেক পক্ষ রয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর একটি পৃথক আপিল আছে এবং একজন আইনজীবীর করা আরেকটি পৃথক আপিল আছে। এ তিনটি আপিল একসঙ্গে শুনানি হচ্ছে।

এর আগে, গত ১৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন আপিল বিভাগ। এরপর আপিল শুনানি শুরু হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন ও আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে গত বছর হাইকোর্টে আলাদা দুটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদকসহ চার ব্যক্তি একটি এবং নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন আরেকটি রিট আবেদন করেন। শুনানি শেষে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়। ওই সংশোধনীতে সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছিল। বিলোপ হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন ও আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে আলাদা দুটি রিট হয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং গণভোট বাদ দেওয়া সংক্রান্ত সেই সংবিধান আইনের ২০ ও ২১ ধারা বাতিল ঘোষণা করা হয়। ওই দুটিসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিলও ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের ১৩৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় গত বছরের ৮ জুলাই প্রকাশিত হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুজন সম্পাদকসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যরা পৃথক লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন। এরপর আপিল বিভাগ গত বছরের ১৩ নভেম্বর লিভ মঞ্জুর (আপিল করার অনুমতি) করে আদেশ দেন। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি আপিল করা হয়।

আপিলের ওপর গত বছরের ৩ ডিসেম্বর শুনানি শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৪, ৭, ৮ ও ১০ ডিসেম্বর আপিলগুলোর ওপর শুনানি হয়। সর্বশেষ গত বছরের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ আপিল শুনানি চলতি বছরের ৫ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করেন।

এর ধারাবাহিকতায় পৃথক তিনটি আপিল আদেশের জন্য আপিল বিভাগের গত ৮ মার্চের কার্যতালিকায় ওঠে। সেদিন আপিল আংশিক শ্রুত (আংশিক শুনানি হয়েছে) হিসেবে বলে গণ্য হবে না বলে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। এর ধারাবাহিকতায় আপিলগুলো গত জুন মাসে আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। গত ২৩ জুন আপিল বিভাগ শুনানি ৬ জুলাই (আজ সোমবার) পর্যন্ত মুলতবি করেন। আজ আপিলের ওপর শুনানি শুরু হলো।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পাশাপাশি অবৈধ ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়। জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়। সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের সাতই মার্চের ভাষণ, ছাব্বিশে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।

একই সঙ্গে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে দোষী করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়। আগে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনে নির্বাচন করার বিধান ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীতে পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিষয়টি সংযোজন করা হয়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *