✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এরমধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকে। গত ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী এ তথ্য জানিয়েছেন মন্ত্রী।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের প্রশ্নোত্তরে তিনি এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।
বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীম প্রশ্ন রেখে বলেন, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত এবং ব্যাংকভিত্তিক হিসাব কী?
জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ৬টি ব্যাংক (অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি, বেসিক ব্যাংক পিএলসি, জনতা ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসি) এর ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসিতে।
তিনি জানান, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৯০২৯ .৬৭ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮৮.৭৯ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮১৩১.০৯ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫৩৯৬.৬৭ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৯২৮১.৭৪ কোটি টাকা এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫০৪৮.৩৯ কোটি টাকা।
‘আবেগ দিয়ে অর্থনীতি চলে না’
ঋণখেলাপির দায়ে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপকে নতুন করে ঋণ দেওয়া নিয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতি ও আর্থিক খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতি রয়েছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এক নয়। একটি কোম্পানি একটি আইনগত ও করপোরেট সত্তা।
আমির খসরু বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে এবং আইন অনুযায়ী বিচার হবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির কারণে একটি কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া যায় না। কারণ, ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা কাজ করেন, প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও দায় রয়েছে এবং অর্থনীতিতে ওই প্রতিষ্ঠানের অবদান রয়েছে।
এস আলম গ্রুপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং বিচার অব্যাহত থাকবে। তবে কোনো কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়ার আগে দেশের অর্থনীতিতে তার কী প্রভাব পড়বে, সেটিও হিসাব করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ইমোশনের ওপর অর্থনীতি চলে না। আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আইন ভঙ্গ করে কাউকে ঋণ দিচ্ছে না। যেখানে পুনঃতফসিলের সুযোগ রয়েছে, আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো সে সুযোগ নিতে পারবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে বিচার চলবে।
সম্পূরক প্রশ্নে হান্নান মাসউদ বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের মধ্যে ঋণ খেলাপির দিক থেকে চ্যাম্পিয়ন। অন্যতম শীর্ষ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠান এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ ডলারের এলসি খোলার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বর্তমানে ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তিনি জানতে চান- সরকার এসব ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে নিলামে তুলে কিংবা রাষ্ট্রয়াত্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে, বিশেষ ঋণ দেওয়ায় মূলত ঋণ খেলাপিদের উৎসাহিত করছে কিনা, এর মাধ্যমে বিদেশি ঋণদাতারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুৎসাহিত হবে কিনা?
জবাবে মন্ত্রী বলেন, জনগণের মাথাপিছু ঋণের বোঝা কমানোর লক্ষ্যে সরকার রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুশৃঙ্খল করার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। সরকারি নিজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণের প্রয়োজনীয়তা কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়কে অধিকতর সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করার এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের অর্থায়ন চাহিদা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জনগণের মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা
কুষ্টিয়া-১ আসনের রেজা আহাম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা।
তিনি বলেন, জনগণের ওপর ঋণের বোঝা কমাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুশৃঙ্খল করার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি নিজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণের প্রয়োজনীয়তা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের অর্থায়নের চাহিদা কমানোর চেষ্টা চলছে।
২০১০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিদেশি ঋণ ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার
কক্সবাজার-৩ আসনের লুৎফর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশ থেকে ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে সরকারের বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে ১৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার আসল এবং ৬ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
১৪ লাখের বেশি কৃষকের ঋণ মওকুফ
চুয়াডাঙ্গা-৪ আসনের মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এ বাবদ ব্যাংকগুলোর পাওনা ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সরকার পরিশোধ করেছে।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চোরাচালানিদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫১৮ কেজি ৬৬৮ গ্রাম স্বর্ণ এবং ৩৭৭ কেজি ৩৪৮ গ্রাম রৌপ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধে ব্যবসা ও ডিজিটাল লেনদেনে ক্ষতি
ঢাকা-১৮ আসনের এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, ২০২৪ সালের ১৮ থেকে ২৩ জুলাই এবং ৫ আগস্ট সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর ব্যবসা পরিচালনাকারী বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা ও নারী কর্মী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এ ছাড়া ই-কমার্স, অনলাইন টিকিটিং, দেশি-বিদেশি অনলাইন পেমেন্ট, অনলাইন ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক লেনদেনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিদেশে থাকা এক কোটির বেশি বাংলাদেশি ওই সময়ে তাদের পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি বলেও জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ প্রদানসহ জুলাই-আগস্টের সংগঠিত গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
