২০ খেলাপি থেকে ৭৪৫ কোটি টাকা সোনালী ব্যাংকের

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে পরিচালন মুনাফায় নতুন রেকর্ড করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।

মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শওকত আলী খান। এ সময় ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আর্থিক প্রতিবেদন তুলে ধরেন ব্যাংকটির প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা (সিএফও) ইকবাল হোসেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪ সালে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা। তবে এক বছরের ব্যবধানে সেই ঘাটতি কাটিয়ে ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের মূলধন উদ্ধৃত হয়েছে ৮৩ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির এমডি শওকত আলী খান বলেন, প্রভিশন সংরক্ষণের পরও ব্যাংকের নিট মুনাফা এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। দীর্ঘদিনের মূলধন ঘাটতির অপবাদ থেকে বেরিয়ে আসা ব্যাংকের জন্য বড় অর্জন।

খেলাপি ঋণ আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়ে এমডি বলেন, গত বছরে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির কাছ থেকে ৭৪৫ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপ থেকেই আদায় হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ আদায়ে তাদের মেশিনারিজ ও সম্পদ নিলামের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সব মিলিয়ে গত বছরে খেলাপিদের কাছ থেকে নগদ আদায় হয়েছে ১ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। নিয়মিত যোগাযোগ, আইনি ব্যবস্থা ও পুনঃতফসিল কার্যক্রমের মাধ্যমে ঋণ আদায় জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। আগামী ২০২৬ সালে এটি ১১ থেকে ১২ শতাংশে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে এক অঙ্কে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সোনালী ব্যাংকের ক্যাপিটাল রিস্ক ওয়েটেড রেশিও বর্তমানে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ১০ শতাংশের চেয়েও বেশি, ফলে ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের বড় অঙ্কের পাওনার কথাও তুলে ধরেন এমডি। তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে এলসি পরিচালনার বিপরীতে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কমিশন এখনো পাওনা রয়েছে। এই অর্থ আদায় হলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

সোনালী ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা এখনও দৃঢ় জানিয়ে শওকত আলী খান বলেন, আমানতের প্রবাহ বাড়লেও ঋণ বিতরণে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি না হয়।

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২৫ ডিসেম্বর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। আগামী ২০২৬ সালে এটি ১১-১২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার তিন বছরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের ক্যাপিটাল রিস্ক ওয়েটেড রেশিও ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ১০ শতাংশের চেয়েও বেশি রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।’

এমডি আরও উল্লেখ করেন, ‘সরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সোনালী ব্যাংকের এখনও উল্লেখযোগ্য পাওনা বকেয়া রয়েছে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে এককভাবে এলসি কার্যক্রম পরিচালনার বিপরীতে ব্যাংকের প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার এলসি কমিশন এখনো পাওয়া বাকি। এই অর্থ আদায় হলে ব্যাংকের মূলধন আরও শক্তিশালী হবে।’ 

কয়েকটি শাখায় ঋণ কেন্দ্রীভূতকরণ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট শাখায় অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে পাঁচটি শাখায় ব্যাংকটির মোট ঋণের ৩৭ শতাংশ রয়েছে, যা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হচ্ছে। বড় ঋণ অন্য শাখাগুলোতে স্থানান্তরের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

খেলাপি ঋণ আদায়ের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে ইতোমধ্যে ৭৪৫ কোটি টাকা আদায় হয়েছে এবং বাকি অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’

আমানত প্রসঙ্গে শওকত আলী খান বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এখনও দৃঢ়। এজন্য ব্যাংকে আমানতের প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ে সতর্কতা অবলম্বন করায় আমানত বৃদ্ধির তুলনায় ঋণ বিতরণ কম হয়েছে। তবে ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের বেশি ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর সোনালী ব্যাংকে বড় কোনো অনিয়ম ঘটেনি। কঠোর ঋণ যাচাই ও সুশাসনের কারণে খেলাপি ঋণের হারও কমছে।’

আগামী ২০২৬ সালের জন্য নতুন ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা খুব শিগগির ঘোষণা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন বছরে ব্যাংকের আয় ২০২৫ সালের তুলনায় আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *