কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের চরম রাজনৈতিক সংকটের মাঝেই তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বৈঠককে কেন্দ্র করে দুই দলের একীভূত হওয়ার জল্পনা তৈরি হয়েছে।

কংগ্রেসের তরফ থেকে মমতাকে দলে যোগদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এ প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কংগ্রেসের নেতারা। 

একীভূত হওয়ার এই জল্পনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এই জল্পনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, বর্তমানে তার প্রতি তৃণমূলের ৬৪ জন বিধায়কের সমর্থন রয়েছে। ঋতব্রত স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাদের দল কোনোভাবেই কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছে না। শুধু বিধায়ক নন, তৃণমূলের বহু সংসদ সদস্যও (লোকসভার এমপি) কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিপক্ষে বলে তিনি দাবি করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এমপি এই মার্জারের (একীভূত) বিরোধী। দলটির এমপি, বিধায়ক, পৌর প্রতিনিধি, জেলা পরিষদ কিংবা পঞ্চায়েত সদস্য–কারও মধ্যেই কংগ্রেসে যাওয়ার কোনো চিন্তা নেই।

একই সুর শোনা গেছে তৃণমূলের নেতা (সাময়িক বরখাস্ত) ঋজু দত্তের কণ্ঠেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে তিনি এই মার্জারের খবর নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ঋজু দত্ত লেখেন, এটি একটি আকর্ষণীয় পরিস্থিতি। তৃণমূলের ১৫ জনের বেশি বিদ্রোহী এমপি এবং ৬৪ জনের বেশি বিদ্রোহী বিধায়ক কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন না। তাহলে তৃণমূল থেকে আসলে কারা কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছেন বা মিশে যাচ্ছেন? 

এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে যোগ দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর পরই সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তার একটি বৈঠক হয়, যা রাজনৈতিক মহলে দুই দলের একীভূত হওয়ার গুঞ্জন বাড়িয়ে দেয়। বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর এটিই ছিল তাদের প্রথম একান্ত বৈঠক। বৈঠকে সোনিয়া গান্ধী তৃণমূল নেত্রীকে কংগ্রেসের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার এবং বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

কংগ্রেস সূত্রের খবর, সোনিয়া গান্ধী মমতাকে স্পষ্ট করে বলেছেন এই আহ্বান কোনো দলীয় মার্জার বা একীভূতকরণের জন্য নয়, বরং এটি বিরোধী জোটের মধ্যে রাজনৈতিক সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা। এর আগে গত সোমবার দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের নেতারা বৈঠক করেন। সেখানেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলগুলোর ঐক্যের ওপর জোর দেন। মমতা বলেন, জোটের শরিকদের উচিত অতীতের সব তিক্ততা ও ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এবার তিনি কংগ্রেসকে বিরোধী জোটের প্রধান নোঙর বা চালিকাশক্তি হিসেবে মেনে নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল এমপি ও দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় -এর বাসভবনে যান। পরে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বৈঠকের ছবি ও তথ্য প্রকাশ করা হয়। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সোনিয়া গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সম্পর্কটি কয়েক দশকের জনসেবা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তবে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি এই চরম দুঃসময়ে মমতাকে ‘গ্রহণ’ করে, তাহলে প্রদেশ নেতৃত্ব কি আদৌ সেই সিদ্ধান্ত মানবে? রাজ্যের যে কংগ্রেস কর্মীরা এতদিন তৃণমূলের দ্বারা অত্যাচারিত, তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজেদের নেত্রী হিসেবে মানবেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। সূত্রের দাবি, রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে মহাবিপর্যয়ের পর কংগ্রেসকে আঁকড়ে বাঁচতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল ও কংগ্রেসের সংযুক্তিকরণ নিয়ে ইতোমধ্যেই দুই দলের শীর্ষস্তরে আলোচনা হয়েছে। কংগ্রেসের তরফ থেকে মমতাকে যোগদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত প্রদেশ নেতৃত্ব।

প্রদেশের একটি অংশ মনে করছেন, মমতাকে দলে নেওয়ার বা এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃণমূল হাত ধরার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এই সময় মমতাকে সঙ্গে নেওয়ার অর্থ, তৃণমূলের ১৫ বছরের দুর্নীতি ও অপশাসনের দায় নিজেদের গায়ে মাখা। অধীর চৌধুরী ও আবদুল মান্নানের মতো প্রবীণ নেতারা এই দলে রয়েছেন। আবদুল মান্নান যেমন সাফ বলে দিচ্ছেন, ‘আমার কংগ্রেস নেতৃত্বের ওপর আস্থা রয়েছে। নো অ্যালায়েন্স উইথ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’ একই সুর শোনা গেছে অধীর চৌধুরীর গলাতেও।

তিনি বলছেন, ‘যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় কংগ্রেস ভাঙিয়েছিলেন, তাকেই এবার গান্ধী পরিবারের কাছে গিয়ে হাতেপায়ে ধরতে হচ্ছে। পাপের ফল ভোগ করতে হবেই।’ তবে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের সুর তুলনায় কিছুটা নরম। তিনি সাফ বলছেন, যদি কেউ দলে আসতে চান, তাহলে তাকে আগে মেনে নিতে হবে যে রাহুল গান্ধীই কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতা এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখ।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *