স্পেনে বাংলাদেশিসহ নথিহীন ৫ লাখ অভিবাসী বৈধতা পাচ্ছেন

𓂃✍︎  নাগরিক প্রতিবেদক 𓂃✍︎ 

স্পেনে অননুমোদিতভাবে বসবাস ও কাজ করা প্রায় ৫ লাখ অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার পথ প্রশস্ত করে একটি ডিক্রি অনুমোদন করেছে দেশটির প্রগতিশীল জোট সরকার।

মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশে অভিবাসন নীতি কঠোরতর হচ্ছে, তখন স্পেন ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটল।

স্পেনের অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রী এলমা সাইজ এই পদক্ষেপকে বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই আইনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—ত্রিমুখী বৈধতা রয়েছে।

সাইজ বলেন, ‘এসব মানুষ আমাদের মধ্যেই বসবাস করছেন। তাঁদের সন্তানরা আমাদের সন্তানদের সঙ্গেই স্কুলে যাচ্ছে। তাঁরা আমাদের শহর ও রাস্তাঘাটে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনছেন। আজ থেকে তাঁরা পূর্ণ অধিকার ও নিশ্চয়তা ভোগ করবেন এবং নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।’

তিনি আরও জানান, শর্ত পূরণ করলে অভিবাসীরা আবাসন ও কাজের অনুমতিপত্র পাবেন, পাশাপাশি তাঁদের একটি সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর এবং বসবাসের অঞ্চলের জন্য একটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কার্ড দেওয়া হবে।

মন্ত্রী উল্লেখ করেন, এই অনুমোদন প্রাথমিকভাবে এক বছরের জন্য কার্যকর হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিবাসন বিধিমালার আওতায় নির্ধারিত অন্যান্য শ্রেণিতে যেতে পারবেন, যা তাঁদের ধাপে ধাপে পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত হওয়ার সুযোগ করে দেবে।

বর্তমানে চীন সফরে থাকা স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় এই উদ্যোগের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, শত শত সংস্থা এবং ৬ লাখেরও বেশি মানুষের নিরলস প্রচেষ্টার কারণেই এটি পার্লামেন্টে আনা সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, স্পেনে নাগরিকদের উদ্যোগে কোনো বিল পার্লামেন্টে তুলতে অন্তত ৫ লাখ স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়।

আবেদনের শর্তাবলি

যারা এই কর্মসূচির আওতায় আবেদন করতে চান, তাঁদের অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে এবং ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির আগে স্পেনে প্রবেশ করতে হবে। আবেদনের সময় তাঁদের টানা পাঁচ মাস স্পেনে বসবাসের প্রমাণ দিতে হবে। আবেদনকারীর পরিবারের সদস্য (প্রথম পর্যায়ের আত্মীয়), জীবনসঙ্গী বা নিবন্ধিত সঙ্গী থাকলে তাঁদের আবেদনও একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

আবেদনের সময়সীমা আগামী ৩১ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যাচাই

রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী ডিক্রির চূড়ান্ত খসড়ায় আবেদনকারীদের অপরাধমূলক রেকর্ডের বিষয়টি কঠোরভাবে দেখা হয়েছে। নিজ দেশে কোনো অপরাধে জড়িত না থাকার সনদ জমা দিতে অভিবাসীদের এক মাস সময় দেওয়া হবে। কেউ যদি তা করতে ব্যর্থ হন, তবে স্পেন সরকার কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সেসব নথি সংগ্রহ করবে।

পার্লামেন্টে অনুরূপ একটি বিল আটকে যাওয়ার পর অভিবাসন আইন সংশোধনের জন্য এই ডিক্রি জারি করা হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল রক্ষণশীল পপুলার পার্টি (পিপি) ইতিমধ্যে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা দিয়েছে। যদিও ২০২৪ সালে পার্লামেন্টে তারা এর পক্ষেই ভোট দিয়েছিল। তখন ৩১০-৩৩ ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছিল, যেখানে শুধু কট্টর ডানপন্থী অভিবাসনবিরোধী দল ‘ভক্স’ এর বিপক্ষে ভোট দেয়।

বিরোধী দল পিপির উপ-সাধারণ সম্পাদক আলমা এজকুরা বলেন, ‘আইন মেনে চলা ব্যক্তিদের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ভবিষ্যতে আসতে ইচ্ছুকদের জন্যও। এটি সামগ্রিকভাবে নাগরিকদের জন্যও ক্ষতিকর, যারা দেখছেন যে সরকার কিছু না করেই জনসেবা খাতের অবনতি ঘটছে।’

জাতীয় বেতারে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, এর ফলে আরও অভিবাসী আসার উৎসাহ (পুল ফ্যাক্টর) তৈরি হতে পারে এবং এটি অপরাধী চক্রকে সুযোগ করে দেবে।

অন্যদিকে ভক্স নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী সানচেজ স্প্যানিশদের ‘ঘৃণা’ করেন এবং তিনি একটি ‘আগ্রাসনকে’ ত্বরান্বিত করছেন।

তবে মন্ত্রী সাইজ বলেন, কট্টর ডানপন্থীদের নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে যে অভিবাসনবিরোধী ঢেউ চলছে, তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্পেন একটি ‘আলোকবর্তিকা’ হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, ‘এটি থামাতে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমি মনে করি, আজ আমাদের দেশের জন্য একটি বড় দিন।’

স্পেন সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীরা। গতকাল মঙ্গলবার আল-জাজিরায় প্রকাশিত এক ভিডিও ক্লিপে বার্সেলোনায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের উল্লাস করতে দেখা যায়। বৈধ হওয়ার সুযোগ তৈরি করায় তাঁরা প্রধানমন্ত্রী সানচেজকে ধন্যবাদ জানান।

মুরুল ওয়াইদ নামের বাংলাদেশি একজন অভিবাসী আল-জাজিরাকে বলেন, এখানে কাজ নেই, থাকার ঘর নেই। এখানে জীবনযাপন খুবই কঠিন। তাই এখন বৈধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর খবরে সবাই খুবই খুশি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *