✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎
১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপ জিতল স্পেন। ভেঙে গেল আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।
রোববার নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় লা রোজা। এর আগে তারা ২০২৪ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছিল।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে জয়সূচক গোলটি করেন বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেস। ২০১০ সালের পর এটি স্পেনের পুরুষ দলের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা।
বল দখলে রেখে ম্যাচে আধিপত্য করা স্পেনের জন্য নতুন কিছু নয়। ফাইনালেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ৬৫ শতাংশ বল দখলে রেখেছিল তারা। এর মধ্যে সফল পাস ছিল ৮৫২টি, আর্জেন্টিনার (৪৬৪) চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে ৭৬২ পাস ছিল নিখুঁত। বলাবাহুল্য, লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল পুরোপুরি ম্যাচ তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
পুরো ৯০ মিনিটে অবিশ্বাস্য ৬৬.৩ শতাংশ বল পজেশন ধরে রেখেছিল স্প্যানিশ আর্মাডা, যেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা স্রেফ ৩৩.৭ শতাংশ বলের মালিকানা নিয়ে কোণঠাসা হয়ে ধুঁকেছে। গোলমুখের নির্মম সত্যটা আরও ভয়াবহ– যেখানে স্পেনের আক্রমণাত্মক ঝড়ের ১৭টা কামানের গোলা আছড়ে পড়েছে, সেখানে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার পাশে জ্বলজ্বল করছে এক বড় শূন্য! ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে এই নীল-সাদা ব্রিগেডকে চেনাই যায়নি। ভাগ্যদেবীর অশেষ কৃপায় বারবার নিশ্চিত গোল হজম করা থেকে বেঁচেছে তারা। কিন্তু ৯০ মিনিটে নাটকের আসল ক্লাইম্যাক্স তখনও বাকি ছিল। স্পেনের ২৩ বার প্রতিপক্ষের বক্সে সশব্দে ঢুকে পড়ার বিপরীতে স্কালোনির দল মাত্র দুবার পা ছোঁয়াতে পেরেছিল লা রোজাদের দুর্গে। স্প্যানিশদের ৬৪৭টি নিখুঁত পাসের আলপনার সামনে মেসিদের ৩৩৭টি পাস আর ৭৯.৫ শতাংশ পাসিং অ্যাকুরেসি স্রেফ খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে। তার ওপর ম্যাচের অন্তিমলগ্নে যখন এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন, তখন আর্জেন্টিনাকে বাধ্য হয়েই অলআউট ডিফেন্সের এক নরক যন্ত্রণার গহ্বরে সেঁধিয়ে যেতে হলো।
সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের সমস্ত ট্যাকটিকসকে একা বুক দিয়ে রুখে দিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ; একের পর এক ১৩টি অতিমানবীয় গোল সেভ করে তিনি যেন একাই আস্ত একটা প্রাচীর! ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নিকো উইলিয়ামসের সেই হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দেওয়া বুলেট কিক কিংবা তার আগে লামিনে ইয়ামালের বিষাক্ত ফ্রিকিক– সবকিছুই এসে আছড়ে পড়ল দিবুর ওই ইস্পাতকঠিন গ্লাভসে। ১৯টি ফাউল করে ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করা আর্জেন্টিনাকে প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধেও যে কোনো আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে দেননি রদ্রি-পেদ্রিরা, তার একমাত্র কারণ মাঝমাঠের ওই সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ।
লিওনেল মেসি এদিন যেন মাঠে থেকেও ছিলেন না। প্রথম ২০ মিনিটে তাঁর পায়ে বল এসেছে মোটে দুবার। যে পা একদিন কাতারে গোটা দেশকে উৎসবে ভাসিয়েছিল, সে পা যেন সেদিন নিউ জার্সির ঘাসে আটকে ছিল। মেসির শরীরী ভাষায় ছিল না সেই পুরোনো তীক্ষ্ণতা, ছিল শুধু ক্লান্ত এক রাজার নীরব উপস্থিতি, যিনি জানেন যুদ্ধ তাঁর হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তবু আর্জেন্টিনা টিকে ছিল একজনের কাঁধে ভর করে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ সেদিন একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করলেন। তোরেসের হেড, লাপোর্তের হেডার, রদ্রির শট, উইলিয়ামসের আক্রমণ—সব ফিরিয়ে দিলেন একের পর এক। ৯০ মিনিট শেষে তাঁর সেভের সংখ্যা দাঁড়াল দশে, বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে যা রেকর্ড। তারপরও যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ কুবারসিকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখলেন। আর্জেন্টিনা নেমে এল ১০ জনে। কয়েক সেকেন্ড পরেই ইয়ামালের ফ্রি-কিক বাঁচিয়ে মার্তিনেজ আরেকবার প্রমাণ করলেন, কেন তাঁকে ছাড়া আর্জেন্টিনা এই ফাইনালে এতক্ষণ টিকে থাকতে পারত না।

১১৩ মিনিটে আরেকবার গোল করেছিলেন তোরেস। কিন্তু তিনি অফসাইডে থাকার কারণে গোলটি বাতিল হয়। ১২০ মিনিটে মেরিনো ও কুবার্সির প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনার একটি গোলের সুযোগ নষ্ট হয়। মেসির ফ্রি কিক থেকে গোলমুখের সামনে সিমিওনে বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর তার আরেকটি শট গোলবারের উপর দিয়ে যায়।
স্পেন প্রথম দল হিসেবে দুটি ভিন্ন মেয়াদে টানা ইউরো ও ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েছে।
তার আগে স্পেন ২০০৮ সালে ইউরো জেতার পর ২০১০ সালের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
ইতিহাসে স্পেন ছাড়া কেবল আরও দুটি দেশ টানা ইউরো ও বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করতে পেরেছে। পশ্চিম জার্মানি ১৯৭২ ইউরো ও ১৯৭৪ বিশ্বকাপ জিতেছিল। তারপর ফ্রান্স ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ও ইউরো ২০০০ জেতে।
তবে এই কীর্তি দুইবার করে দেখানোর একক গৌরব ও বিশ্বরেকর্ড এখন শুধুই স্পেনের।
এক গোল হজম করেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন
শুধু শিরোপা জয়ই নয়, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ডের মালিকও বনে গেছেন লা রোহারা।
পুরো টুর্নামেন্টে মোট ৮টি ম্যাচ খেলেছে স্পেন। আর এই আট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মাঠে খেলতে নেমে হজম করেছে মাত্র ১টি গোল! বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই কোনো বিজয়ী দলের পক্ষে সর্বনিম্ন গোল হজম করে শিরোপা জেতার রেকর্ড।
এর আগে কোনো বিশ্বকাপজয়ী দলের সর্বনিম্ন গোল হজম করার রেকর্ডটি ছিল ২ গোলের। তিনটি দল যৌথভাবে এই রেকর্ডের অধিকারী ছিল। সর্বপ্রথম এই রেকর্ডটি গড়েছিল ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে মাত্র দুটি গোল হজম করেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। এরপর ২০০৬ সালে ইতালি ও ২০১০ স্পেনও এই রেকর্ডের ভাগিদার হয়।
পূর্বের এই দলগুলো প্রতিটি ৭টি করে ম্যাচ খেলেছিল। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে একটি অতিরিক্ত ম্যাচ খেলা সত্ত্বেও স্পেন পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষকে মাত্র একবারই তাদের জালে বল পাঠাতে দিয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের চার্লস ডি কেটেলারে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে স্পেনের বিপক্ষে গোল করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বিশ্বকাপ জিতে ৬১৫ কোটি পেল স্পেন
স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে ২৩তম বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। ৪৮ দলের আসরে শুধু ফুটবলের লড়াই নয়, ছিল রেকর্ড পরিমাণ অর্থ পুরস্কারও। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য মোট ৮৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার প্রাইজমানি বরাদ্দ রেখেছিল ফিফা, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৩.১২ টাকা হিসেবে)।
সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপের আগের তুলনায় ১৫ শতাংশ প্রাইজমানি বাড়িয়েছিল ফিফা। কোনো দল যেন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে লক্ষ্যেই প্রাইজমানি বাড়িয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নিউজার্সি স্টেডিয়ামে হওয়া ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরেছে স্পেন। স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে রদ্রির দল। অন্যদিকে রানার্সআপ আর্জেন্টিনাও পেয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ।
চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবচেয়ে বেশি ৫ কোটি মার্কিন ডলার পাচ্ছে স্পেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৬১৫ কোটি টাকা। ফাইনালে হেরে রানার্সআপ হওয়া লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা পাবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা প্রায় ৪০৬ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থান অর্জন করা ইংল্যান্ডের প্রাইজমানি ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫৭ কোটি টাকা। আর চতুর্থ হওয়া ফ্রান্সের জন্য বরাদ্দ ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা প্রায় ৩৩২ কোটি টাকার সমান।
নকআউট পর্বে খেলেও শিরোপার লড়াইয়ে এগোতে না পারা দলগুলোর জন্যও রয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ পুরস্কার। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া চারটি দল প্রত্যেকে পাবে ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার (প্রায় ২৩৩ কোটি টাকা)। শেষ ষোলোতে বাদ পড়া আটটি দলের প্রত্যেকের প্রাপ্য ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার (প্রায় ১৮৪ কোটি টাকা)।
অন্যদিকে, শেষ ৩২ দলের রাউন্ড থেকে বিদায় নেওয়া ১৬টি দল পাবে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার করে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা। আর গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া প্রতিটি দলের জন্য রাখা হয়েছে ৯০ লাখ ডলার বা প্রায় ১১০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া প্রাইজমানির বাইরে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলকে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই প্রস্তুতি, ভ্রমণ, আবাসন ও অন্যান্য খরচ বাবদ ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার করে দিয়েছে ফিফা। ফলে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ওঠা কোনো দলই আর্থিক দিক থেকে খালি হাতে ফিরছে না।
