বৃষ্টিতে ডুবেছে ৩ জেলা, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে গিয়ে দেখা গেল, পুরো বিদ্যালয় আঙিনা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। পানি প্রবেশ করেছে পরীক্ষার কক্ষেও। মাঠের পশ্চিম পাশের পুরোনো একতলা টিনশেড ভবনটির পুরোটাতেই পানি ঢুকেছে। ভবনটির প্রতিটি কক্ষে বসার বেঞ্চে পা তুলে লিখছে শিক্ষার্থীরা। হল পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকেরাও চেয়ারে পা তুলে বসে আছে। এসব পানিতে নালার ময়লা ভাসতে দেখা গেছে।

দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় কুমিল্লা নগরের প্রায় সবখানে এমন অবস্থা দেখা গেছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হওয়া বৃষ্টির পানি সড়ক ছাপিয়ে ঢুকেছে মানুষের বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও। এতে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়ে।

মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে কুমিল্লা নগর ঘুরে দেখা গেছে, নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকায় কান্দিরপাড়-ধর্মপুর সড়কে হাঁটুপানি। এই সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় অটোরিকশা বিকল হয়ে যায়; যার কারণে চালকেরা সড়কটি দিয়ে অটো চলাতে রাজি হন না। একই অবস্থা নগরের কান্দিরপাড়-ঈদগাহ সড়কে। সড়কটির স্টেডিয়াম ও পুলিশ সুপারের বাসভবনের সামনেও হাঁটুর ওপর পর্যন্ত পানি। পুলিশ সুপারের বাসভবনের সামনে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি ও বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সসহ কয়েকটি গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পাশের পুরো স্টেডিয়াম মার্কেটে জলাবদ্ধতার পানি। মার্কেটের অনেক দোকানে পানি ঢুকে পড়তে দেখা গেছে।

নগরের সালাউদ্দিন মোড় থেকে টমছমব্রিজ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়টিতেও দেখা গেছে জলাবদ্ধতা। সেখানেও বিকল হওয়ার ভয়ে খুব বেশি যান চলাচল করছে না। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ছোটরা সড়কেরও একই অবস্থা। খোদ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের সামনের সড়কও তলিয়ে গেছে পানিতে। প্রতিটি স্থানেই পানি সঙ্গে নালার ময়লা ভাসতে দেখা গেছে।

এ ছাড়া নগরের চকবাজার, রেসকোর্স, শাসনগাছা, ঠাকুরপাড়া, দ্বিতীয় মুরাদপুর, কাশারিপট্টি, চর্থাসহ অধিকাংশ এলাকার সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালার (উচ্চবিদ্যালয়) প্রধান শিক্ষক শুধাংশু কুমার মজুমদার জানিয়েছেন, কেন্দ্রটিতে মোট ৬০৮ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টির কারণে একতলা ভবনটির কয়েকটি কক্ষে পানি প্রবেশ করেছে। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও পরীক্ষায় কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

পরীক্ষা শেষে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘খুবই বাজে পরিবেশে পরীক্ষা দিয়েছি আজকে। পরীক্ষা শুরুর একটু পরই হলে পানি প্রবেশ করে। নোংরা পানির মধ্যে বসেই পুরোটা পরীক্ষা দিতে হয়েছে। আমার প্যান্ট ও জুতা ভিজে গেছে।’

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে বিভিন্ন কাজ এরই মধ্যে শুরু করেছেন। প্রতিটি নালা ও খাল পরিষ্কার করা হচ্ছে। আজকে ভারী বৃষ্টির কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রতিটি নালা ও খাল দিয়ে যেন দ্রুত পানি সরে যায়, এ জন্য সিটি করপোরেশনের নিয়মিত কর্মীদের পাশাপাশি দুটি বিশেষ টিম কাজ করছে।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আরও বলেন, ‘নগরের প্রতিটি এলাকায় মানুষ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী নালা-খালের পাশে বা সড়কে রাখে। বৃষ্টি হলে এসব নির্মাণসামগ্রী নালা-খালে পড়ে পানি নামতে বাধা সৃষ্টি করে। আমরা এসব নিয়েও কাজ করছি। আমাদের চেষ্টা আছে, আশা করছি আগামী বর্ষার আগেই আমরা একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারব।’

ডুবে গেছে ফেনী শহরের বেশির ভাগ এলাকা

অতিভারী বৃষ্টিতে ডুবে গেছে ফেনী শহরের বেশির ভাগ এলাকা। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয় শহরে। দুই ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে ডুবে যায় প্রধান সড়ক ও উপসড়কগুলো। বৃষ্টির সঙ্গে ছিল ঝোড়ো বাতাসও। প্রবল বাতাসে শহর ও শহরতলিতে ১০ থেকে ১২টি গাছ উপড়ে পড়েছে। দুর্যোগে বিপাকে পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অনেক কেন্দ্রে মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল বিকেল থেকে আজ বেলা তিনটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এটি এই মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টি। এ মাত্রার বৃষ্টিতে অতিভারী বৃষ্টি হিসেবে ধরা হয় বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (উচ্চ পর্যবেক্ষক) মো. মজিবুর রহমান বলেন, আজ বেলা ৩টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৫০ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় জেলাজুড়ে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আজ সকাল থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায়। একপর্যায়ে তীব্র ঝড় ও মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়। টানা দুই ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক পানিতে ডুবে যায়। শহরের শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়ক, মিজান রোড, নাজির রোড, মাস্টারপাড়া, পেট্রোবাংলা, পাঠানবাড়ি, একাডেমি, সদর হাসপাতাল মোড়, শান্তি কোম্পানি সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পানিতে ডুবে যায়। প্রবল বর্ষণে অলিগলিতে পানি জমে যাওয়ায় অফিসগামী যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে। দুর্ভোগে পড়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও।

বৃষ্টির সঙ্গে প্রবল বাতাসে ফেনী সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ সড়কে গাছ ভেঙে পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ফেনী সদর উপজেলার কালীদহ ইউনিয়নের আলোকদিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, তীব্র ঝড়ে সড়কের আশপাশে ১০ থেকে ১২টি গাছ পড়ে যাওয়ায় গ্রামীণ এলাকার যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ

তীব্র ঝড়বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার সময় ও কেন্দ্র থেকে পরীক্ষার্থীদের নিয়ে বাড়িতে ফিরতে গিয়ে বৃষ্টির বাধায় পড়েছেন অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীরা। রাস্তায় পানি জমে থাকায় যানবাহন পেতেও সমস্যা হয়েছে। অনেকে পানি মাড়িয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ফেনী শহরের পাশাপাশি উপকূলীয় উপজেলা সোনাগাজী, সীমান্তবর্তী ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলায়ও পরীক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েছে। এসব উপজেলার সড়কগুলোতে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে বিদীত জাহাঙ্গীর। পরীক্ষা দিতে যাওয়া ও আসার পথে তাকে দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়েছে বলে জানায়। সে বলে, ‘পরীক্ষাকেন্দ্র সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে বৃষ্টি চলে আসে। আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। তাই কেন্দ্রে যেতে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। তীব্র ঝড়বৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় বিকল্প ব্যবস্থা করে আলো জ্বালানো হয় কেন্দ্রে। সেই আলোতে আমাদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে।’

গত রোববার কালবৈশাখী ঝড়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গত ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে ফেনীর পরশুরাম উপজেলা। আজ সকাল থেকে আরও এক দফা ঝড়বৃষ্টি হওয়ায় উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা ডুবে যায়। এ অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে ঠিক সময়ে পৌঁছালেও মোমের আলোয় পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাদের। অনেক কেন্দ্রে ঝোড়ো বাতাসে বারবার মোমবাতি নিভে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীদের মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটেছে।

দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবে গেছে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করলেও দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবে গেছে মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, প্রবর্তক, হালিশহর, ঈদগাহসহ শহরের নিচু এলাকাগুলো। মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন সড়কে এ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ফলে স্কুল শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, শ্রমজীবী মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। সড়কে বাস, সিএনজিসহ যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। রিকশায় দ্বিগুণ তিনগুণ ভাড়া আদায় করছেন চালকরা।

মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে নগরের প্রবর্তক মোড়সহ বেশ কিছু এলাকা হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, প্রবর্তক এলাকায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ করছে। চলমান উন্নয়ন কাজের কারণে পানি চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকায় পানি জমলেও তা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নগরীতে মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই সামান্য বৃষ্টিতেই প্রবর্তক মোড়, রহমতগঞ্জ, কাতালগঞ্জ ও মুরাদপুর এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে প্রবর্তক মোড়ে পানি জমে থাকায় পথচারী ও যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী।

সম্পর্কিত লেখা:

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *