✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
২০২৬ সালে জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন পরীক্ষার্থী, যা গত বছর ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন।
সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট ও মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমেও ফল জানা যাচ্ছে।
এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। মেধার সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী।
গত বছর ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সে বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার মোট ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। এসব বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর ফলাফলেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। ৯টি সাধারণ বোর্ডে অংশ নেওয়া ৬ লাখ ৬২ হাজার ৬৬৩ জন ছেলে পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৮১৪ জন। ফলে ছেলেদের পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৭৬ জন মেয়ে পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৭৯৬ জন। মেয়েদের পাসের হার ৬৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েদের এগিয়ে থাকার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এবার ৪৭ হাজার ৩০৪ জন ছেলে এবং ৫৮ হাজার ৭০৫ জন মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ফলে পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই সূচকেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ফল ভালো হয়েছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তুলনায় মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল আরও খারাপ হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষায় এবার ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। এ বোর্ডে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন শিক্ষার্থী।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। এ বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৭৯ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৪ জন। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ হাজার ২১৫ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৪ হাজার ৪৭০ জন। ফেল করেছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৩ হাজার ৪৯৪ জন। সব মিলিয়ে কারিগরি বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন।
গত দেড় দশকের এসএসসি ও সমমানের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এবারের ফলের অবনতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর তা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়, যা ছিল ওই সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ হার। পরে মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পরীক্ষার ধরনে বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে পাসের হারে ওঠানামা দেখা যায়।
২০১৭ সালে খাতা মূল্যায়নে নতুন মানদণ্ড প্রয়োগের পর পাসের হার কমে ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে আসে। এরপর করোনাকালে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২০২১ সালে বিষয় ম্যাপিং ও বিশেষ মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করায় পাসের হার বেড়ে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছায়, যা এ যাবৎকালের অন্যতম সর্বোচ্চ হার।
করোনা-পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক পরীক্ষাপদ্ধতি ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা ফিরলে পাসের হার আবার কমতে শুরু করে। গত বছর ২০২৫ সালে পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে। এবার তা আরও কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে। ফলে ২০০৭ সালের পর গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে।
এবারের ফল বিপর্যয়ে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অকৃতকার্যতার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এ দুটি মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া এবং খাতা মূল্যায়নে তুলনামূলক কঠোরতা এবারের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা।
ফলাফলের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ফলাফলেও। এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬৯টিতে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৬৮টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অন্যদিকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি—এমন শূন্য পাস বা জিরো পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১২টিতে। এতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গতকাল রোববার ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পুনর্নিরীক্ষণের জন্য অনলাইনে আবেদন শুরু হবে ১১ আগস্ট থেকে, চলবে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত। এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় গত ২১ এপ্রিল, পরীক্ষা চলে ২০ মে পর্যন্ত।
ফল জানবেন যেভাবে
শিক্ষা বোর্ড সূত্র বলছে, সব শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে ফল প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি পরীক্ষার্থীরা এসএমএসের মাধ্যমেও ফল জানতে পারবে।
জানা গেছে, মোবাইল ফোনে যেকোনো সিম ব্যবহার করে এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানা যাবে। এ জন্য মেসেজ অপশনে গিয়ে প্রথমে SSC লিখে স্পেস দিয়ে বোর্ডের নামের প্রথম তিন অক্ষর, এরপর রোল নম্বর লিখতে হবে। এরপর স্পেস দিয়ে YEAR লিখে ১৬১৪০ নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএসে পরীক্ষার ফল জানিয়ে দেওয়া হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এসএমএসের ফরম্যাট হবে SSC DHA ROLL YEAR। মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন দাখিল পরীক্ষার্থীদের ফল জানতে SSC MAD ROLL YEAR লিখে ১৬১৪০ নম্বরে পাঠাতে হবে। আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের SSC TEC ROLL YEAR লিখে একই নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হবে। প্রতিটি এসএমএসের জন্য ১ টাকা ৩৯ পয়সা চার্জ প্রযোজ্য হবে।
চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি), দাখিল ও এসএসসি (ভকেশনাল) পরীক্ষা গত ২১ এপ্রিল শুরু হয়। এবারের পরীক্ষায় সারা দেশে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থীর অংশ নেয়। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী রয়েছে ১৪ লাখ ১৮ হাজারের বেশি। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষার্থী তিন লাখের বেশি। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অংশ নিচ্ছে ১ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। মোট ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে এবারের এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মোট ৩০ হাজার ৬৬৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি কেন্দ্র ঢাকা বোর্ডে, ৫১০টি এবং সবচেয়ে কম কেন্দ্র ময়মনসিংহে, ১৮৮টি। অন্যদিকে, মাদ্রাসা বোর্ডের আওতায় ৭৪২টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ৬৫৩টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
