✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
‘এক-এগারোর সময় আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের তথ্য বিভিন্ন সাক্ষীর বর্ণনায় পাওয়া গেছে এবং পর্যায়ক্রমে এগুলো বিচারে রিফ্লেকশন হবে’ বলে উল্লেখ করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
শনিবার ঢাকা সেনানিবাসে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) কমপ্লেক্সে থাকা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
এ সময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘বিচারের অংশ হিসেবে আজ আমরা ডিজিএফআইর কমপ্লেক্সের ভেতরে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) পরিদর্শন করেছি। এই জেআইসি নামক প্রতিষ্ঠানটি ছিল মানুষকে ধরে এনে বন্দী করে রেখে তাদের ওপর অত্যাচার এবং নির্যাতনের একটা সেল। যেটা পরবর্তীতে আয়নাঘর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সেখানে অমানবিকভাবে বন্দীদের ধরে এনে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর রাখা হয়েছে। সেই নির্মম চিত্র আজকে এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে কিছুটা অনুভব করা গেছে।’
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আজ যে জেআইসি আমরা পরিদর্শন করেছি এক-এগারোর সময় আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তারই কোনো একটি কামরায় আনা হয়েছে। তাঁর ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল। এটাও কিন্তু আমাদের ইনভেস্টিগেশনে বিভিন্ন সাক্ষীদের মুখের বর্ণনা থেকে পাওয়া গেছে। পর্যায়ক্রমে এগুলো বিচারে রিফ্লেকশন হবে।’
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ‘আমরা বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ জানাব, বাংলাদেশে যাতে আর কোনো টিএফআই সেল অথবা জেআইসি বা তথাকথিত আয়নাঘর ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত না হয়। দেশের কোনো নাগরিক যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাঁকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে এবং বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। কিন্তু এক্সট্রা জুডিশিয়াল কোনো কিলিংয়ের শিকার যাতে কোনো নাগরিক না হয়। কেউ যাতে কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা অহেতুক হয়রানির শিকার না হয়। কেউ যেন বন্দিশালায় দিনের পর দিন মাসের পর মাস হয়রানির শিকার না হয়।’
আমিনুল ইসলাম বলেন, গোপন এই বন্দিশালায় অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, হুম্মাম কাদের চৌধুরীসহ বহু মানুষকে বছরের পর বছর নির্জন কক্ষে অমানবিকভাবে বন্দি রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, তাকেও কিন্তু এই জেআইসি সেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তিনি কতদিন বন্দি ছিলেন, তার নিজের হাতের একটা লেখা ছিল ‘এইচ কিউ সি’। সেটি পরে সাদা রং করে প্লাস্টার করে দিয়েছে। প্লাস্টারের পরেও তার এই লেখাটা কিন্তু এখনো জেআইসি সেলের একটি রুমে আছে। আমরা এগুলো সিলগালা করে রেখেছি। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এগুলো আমাদের কাস্টডিতে থাকবে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই জেআইসিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ইসলামিক সংগঠনের নেতা, ভিন্ন মতের ব্যক্তিদের ধরে আনা হয়েছিল। অনেক মানুষকে এখান থেকে পরে গুম করা হয়েছে। অনেক ভিকটিমদের এখন পর্যন্ত কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এর জবাব তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে। তবে ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো টিএফআই বা জেআইসি তথা আয়নাঘর প্রতিষ্ঠিত না হয়, সে জন্য আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাব।
তিনি বলেন, কোনো নাগরিক অপরাধ করলে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কিন্তু বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যার শিকার যেন কেউ না হন, এভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে অহেতুক হয়রানির শিকার যেন না হন, সেটিই আমরা চাইব।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলে গত ১৬ বছর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি অমানবিক রাষ্ট্র কায়েম হয়েছিল। অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এই আয়নাঘর নামীয় টর্চার সেল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অতিউৎসাহী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য। তারা সরকার বিরোধী মতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা বা ভিন্ন মতপথের মানুষকে গুম করে এসব বন্দিশালায় রাখতেন। গুমের এমন অনেক ভুক্তভোগীর আমরা এখন পর্যন্ত কোনো হদিস পাইনি।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে টিএফআই ও জেআইসিতে সংঘটিত গুম-নির্যাতনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকাজ চলছে। এইসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেক কর্মকর্তাকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে এখানে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এই পরিদর্শন নিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিমূলক কথা বলছেন। শেখ হাসিনা তার যখন যেমন মন চায়, সেভাবে কথা বলেন, তাদেরই প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের ডিফেন্সের বন্ধুরাও একই ভাষায়, একইরকম করে বিভ্রান্তিমূলক কথা বলেন।’
তিনি জানান, যেকোনো বিচারকের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের আইনগত বৈধতা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে যে বিচার হচ্ছে সেটা স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানের। এই পরিদর্শন ন্যায়বিচারের জন্য গুরুত্ব বহন করবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী, চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামসহ প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষের আইনজীবী, ডিজিএফআইয়ের প্রধান ও নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি দৈনিক মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ল’রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মো. ইয়াসিন, সাধারণ সম্পাদক আরাফাত মুন্না, সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ডালিম, কার্যনির্বাহী সদস্য মাজহারুল হক মান্না আজকের পরিদর্শনে অংশ নেন।
