নদীভাঙন ঠেকাতে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তৌহিদী জনতার

✍︎ সিলেট প্রতিনিধি ✍︎ 

‘সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি পক্ষ’। কিন্তু তারা কারা-সে বিষয়ে এখন কেউ কথা বলছেন না।

সিলেটের বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’র নামে প্রচারণা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক হয়েছে। কারা ‘তৌহিদী জনতা’র নামে প্রচারণা চালাচ্ছে এবং এর উদ্দেশ্য কী, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার।

ইউএনও বলেন, নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিষয় জড়িত কিনা, সেটিও প্রশাসন জানার চেষ্টা করছে। তবে এখন পর্যন্ত জানা গেছে- নৌকাবাইচের বিরোধিতাকারীদের মূল আপত্তি চলাচলে অসুবিধা, কৃষিজমি নষ্ট, ফসলহানি ও নদীভাঙন নিয়ে।

তিনি বলেন, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে দেখার জন্য লাউতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নৌকাবাইচের পক্ষে বা বিপক্ষের কেউই প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি।

শনিবার রাতে স্থানীয় বারইগ্রাম বাজারে নৌকাবাইচের পক্ষ-বিপক্ষের লোকজনকে নিয়ে বৈঠক করেন ইউপি চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

সোনাই নদীতে লাউতা ও বাহাদুরপুর যুবসমাজের উদ্যোগে আগামী ২৮ আগস্ট নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা রয়েছে। এ আয়োজন বন্ধের দাবিতে কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চলছে। ‘তৌহিদী জনতা’র নামে একটি পোস্টারও ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়। পরে অবশ্য পোস্টারটি সরিয়ে নেন এর প্রচারকারী যুবক মাসুম বিন নুর উদ্দিন।

মাসুম বিন নুর উদ্দিন বলেন, স্থানীয় মুরব্বি, মাওলানা ও ব্যবসায়ীদের অনুরোধে তিনি পোস্টারটি ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন। শনিবার দুপুরে সেটি সরিয়ে নিয়েছেন। 

নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ হলে এলাকার ক্ষতি হয়, কৃষকদের ফসলহানি হয় এবং নদীপাড়ের বাসিন্দারা ভাঙনের শিকার হন। এসব কারণেই তারা নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

তবে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি বা ঈমানি দায়িত্ববোধের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা- জানতে চাইলে মাসুম বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না। মাওলানা আব্দুল হক, হাফিজ শিব্বির আহমদ ও স্থানীয় ব্যবসায়ী হোসেন আহমদ তাকে পোস্টারটি প্রকাশ করতে অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান তিনি।

‘নৌকাবাইচ বন্ধ করা ঈমানী দায়িত্ব’

বড়লেখার হাটবন্দ এলাকার এফ আর মহী সুন্না মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মো. আব্দুল হক নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে অনড় থাকার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, নৌকাবাইচসহ প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেওয়া হলে তা জুয়ার পর্যায়ে পড়ে এবং ইসলাম তা নিষেধ করেছে। এটি বন্ধ করা সবার ঈমানী দায়িত্ব। 

এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নৌকাবাইচ আয়োজন করলে চলাচলে অসুবিধা হয়, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নদীভাঙন বাড়ে বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে এলাকায় জুয়া ও মাদকের উপদ্রবও বাড়তে পারে।

আব্দুল হক বলেন, শনিবার জোহরের নামাজের পর বারইগ্রাম বাজারে সভা করে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিযোগিতা বন্ধের জন্য মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধ করা হয়েছে। প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ারও প্রস্তুতি চলছে।

তার দাবি, গত বৃহস্পতিবার বারইগ্রাম মসজিদে সভা করে নৌকাবাইচের প্রতিবাদ করা হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিভিন্ন মসজিদেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নুর উদ্দিনকে ‘তৌহিদী জনতা’র নামে প্রচারণা চালাতে তারাই অনুরোধ করেছে।

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন মাসুম বিন নুর উদ্দিন নামের এক যুবক। তিনি ১৮ আগস্ট রাত ৭টা ২৯ মিনিটে নিজের ফেসবুকে একটি পোস্টার শেয়ার করেন। সেই পোস্টারে প্রথম ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামটি দেখা যায়। নুর উদ্দিন ৮টা ৯ মিনিটে পোস্টটি এডিট করে আরেকটি পোস্টার যুক্ত করেন। সেখানে এভাবে লেখা দেখা যায়, ‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা।’ ওই পোস্টারে ঈমানি দায়িত্ববোধে সবাইকে উপস্থিত হতে বলা হয়।

দ্বিতীয় পোস্টারে ‘নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভার’ কথা বলা হলেও তিনি মূলত নৌকাবাইচ বন্ধের জন্যই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। নুর উদ্দিন শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে ফোনে বলেন, ‘ওটা ভুল করে লিখেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধ চাই। তবে এখানে ধর্মীয় কোনো বিষয় নেই। নদী ভাঙন ঠেকাতে একথা বলেছি।’

কালবেলার সঙ্গে কথা বলার পর নুর উদ্দিন অবশ্য পোস্টারটি ফেসবুক থেকে ডিলিট করে দিয়েছেন। তার দাবি, পরামর্শ সভার আয়োজকরা তাকে পোস্টার বানাতে বলেছিলেন।

২০ আগস্ট বারিগ্রাম বাজার মসজিদে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভার পর মাসুম বিন নুর উদ্দিন একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটি তিনি ‘মুক্ত বাতাস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন। নুর উদ্দিন নিজেই মূলত পেজটি পরিচালনা করেন।

সেই ভিডিওতে স্থানীয় আলেম এবং মুরব্বিদের কথা বলতে দেখা যায়। ভিডিওটির অধিকাংশ বক্তব্যে নদীভাঙনের কথা এসেছে, এসেছে ধান রক্ষার কথা। কয়েক জায়গায় ধর্মীয় অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হলেও নৌকাবাইচকে কোথাও ধর্মবিরোধী বলা হয়নি। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসানো হয়-এমন অভিযোগ তুলে তাকে হারাম বলা হয়েছে।

ভিডিওতে এক আলেমকে বলতে শোনা যায়, ‘এলাকার পরিবেশ সুন্দর করার লাগি, এলাকার ধর্মীয় অবস্থানরে সুন্দর লাহার লাগি, বিশৃঙ্খলা থেহে বাঁচানোর লাগি, নদী ভাঙন ঠেকানোর লাগি এটা বন্ধ করতে অইবো।’

আরেকজন মুরব্বি ভিডিওটিতে বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র কইরা একবার এক লোক মারা গেছে। একজন মহিলা মারা গেছে। নৌকাবাইচে মাইর অইছে। নদীর দুই সাইডে ধানের ছড়া লাগানো আছে। এগুলো নষ্ট হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এগুলো মেনে নেবে না। অসামাজিক খারাপ কাজ হইব। এগুলো সম্পূর্ণ হারাম কাজ। এই কাজ দ্বারা এলাকার ধর্মীয় পরিবেশ ক্ষুণ্ন হইব।’

প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক বলেন, ‘এটি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং সম্পূর্ণ সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়। ‘তৌহিদী জনতা’ কিংবা নাগরিক সমাজের নামে কারা ব্যানার করেছে, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তবে এলাকার সচেতন নাগরিকদের মূল দাবি হলো এ অঞ্চলে আর নৌকাবাইচ আয়োজন না করা।’

তিনি বলেন, ‘অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুই নৌকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছেন, এমনকি হাত-পা ভাঙার মতো ঘটনাও ঘটেছে। নৌকাবাইচের পাশের এলাকায় গানের আসরকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বড় ধরনের এ আয়োজনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।’

আয়োজকদের দাবি, নৌকাবাইচ সংস্কৃতির অংশ

নৌকাবাইচ আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দিন বলেন, নৌকাবাইচ আবহমান বাংলার সংস্কৃতির অংশ। এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিধিনিষেধ নেই। অতীতেও তারা শান্তিপূর্ণভাবে নৌকাবাইচ আয়োজন করেছেন এবং স্থানীয় মানুষ এতে অংশ নিয়ে আনন্দ উপভোগ করেছেন।

তিনি বলেন, গত কয়েক দিন ধরে এলাকার কয়েকজন যুবক নৌকাবাইচের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে তারা আয়োজকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করেননি। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই তারা নৌকাবাইচ আয়োজন করেন।

হেলাল উদ্দিন আশা করেন, স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় বিষয়টির সমাধান হবে। বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, সাবেক চেয়ারম্যান গৌছ উদ্দিন ও মোল্লাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি দেখছেন বলে জানান তিনি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *