✍︎ কুমিল্লা প্রতিনিধি ✍︎
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরী থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। গ্রেফতার সুমন ওই স্কুলছাত্রীকে বহনকারী অটোরিকশাচালক।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম নগরী থেকে সুমনকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে নিয়ে পুলিশের একটি দল কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়। তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানখেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এতে কিশোরীটি জীবন বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সুমনের বাড়ি কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার জয়নগর এলাকায়। তিনি রাতে পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। স্থায়ী বাড়ি না থাকায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। তবে কিছুদিন আগে ঘর বিক্রি করে সেখান থেকে চলে যান বলে জানা গেছে।
পুলিশের ভাষ্য, সুমনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই। তিনি মোবাইল ফোনও ব্যবহার করতেন না বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়। ঘটনার পর থেকে তাঁকে খুঁজতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছিল।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পাওয়া যায়।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, পদুয়ার বাজারে নামার পর তাজমিন কীভাবে লালমাইয়ের ওই স্থানে গেল, তা তদন্ত করা হচ্ছে। নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিষয়েও তদন্ত চলছে।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা আবদুল আলীম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করেন। পরিবারের সদস্যরা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
চার দিন আগে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। পরে সে কক্সবাজারে গিয়েছিল বলে জানা গেছে। ফেরার পথে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নেমেছিল।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুমনের খালাশাশুড়ি ও বোনজামাইকে আটক করা হয়েছে।
নিহত তাজমিনের মায়ের আহাজারি
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ শুক্রবার যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার মা-বাবা। তাঁদের কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে মেয়েকে হারানোর অসহায়তা।
তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে থাকত সে। পড়ত স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়াতনের সপ্তম শ্রেণিতে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গ্রামের বাড়িতে দেখা যায়, তাজমিনের মা-বাবা ও স্বজনেরা শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন। মেয়েকে হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়া মা কেয়া খাতুন একপর্যায়ে মেয়ের শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সাংবাদিকেরা স্বজনদের ছবি তুলতে গেলে তাজমিনের মা কেয়া খাতুন আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘কী হবে এসব ছবি তুলে। আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, এখন আর কিছু বলব না।’
কেয়া খাতুন জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মাকে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে বলেছিল। কেয়া খাতুন মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও সে কিছু জানায়নি। মেয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে ওই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান তিনি।
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তিনিও বাক্রুদ্ধ। মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে কীভাবে তার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি।
আবদুল আলীম জানান, ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানায়। গতকাল রাত পৌনে ২টার দিকে মেয়ের কাছ থেকে একটি খুদে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পান তিনি। বার্তায় মেয়েকে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তখন ঘুমিয়ে থাকায় তিনি বার্তাটি দেখতে পারেননি। সকালে বার্তা দেখে লোকেশনে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান।
আবদুল আলীম বলেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানাই।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাজমিনের আর কোনো ভাই-বোন নেই। সে মেধাবী ছিল। বিভিন্ন ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তাকে এভাবে হারিয়ে শোকাহত স্বজন ও এলাকাবাসী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
