✍︎ ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি ✍︎
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন।
১৮৫ ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৮৩টির ফলাফলে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মির্জা ফয়সল আমিন পেয়েছেন ২ লাখ ২৪ হাজার ১৬৫ ভোট।অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৫০ ভোট।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে আসনটির ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। অন্য প্রার্থীরা হলেন- বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের বটগাছ প্রতীকে মো. আব্দুল আলীম নিজামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে মো. খাদেমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের ডাব প্রতীকে হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক।
বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী ফলাফল সংগ্রহ ও পরিবেশনকেন্দ্রে এ ফলাফল ঘোষণা করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম।
এদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনে ২১ প্লাটুন বিজিবি, ২ হাজার ২৭২ পুলিশ সদস্য ও ২ হাজার ৪০৫ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটি, বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে আছেন। চার বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ ১৭৭ দেশি-স্থানীয় পর্যবেক্ষক নির্বাচনী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার কথা আছে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তারা হলেন- রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাই ও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৬৮। নারী ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬৬ জন। আর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন।
প্রসঙ্গত, গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা, আগাম সিল মারাসহ নানা অভিযোগ জামায়াতের
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা, ব্যালটে আগাম সিল মারাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এরশাদ আমলের স্টাইলে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির প্রার্থীর বড় ভাই রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সুযোগে প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ ভোটারদের প্রভাবিত করেছেন। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাই ছাড়াই পোলিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা ছেড়ে একটি দলের হয়ে কাজ করেছেন।
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, ‘আমরা তথ্য পেয়েছি—ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে, ভোট দেওয়ার আগেই অনেকের ভোট প্রদান হয়ে গেছে। ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্বাচনী এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র না থাকার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় আমরা গভীর উদ্বিগ্ন।
সরকারদলীয় শীর্ষ পদে থেকে এই উপনির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করা হলেও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে।’
জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ ধরনের বক্তব্য জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
ভোটের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে নয় দফা লিখিত অভিযোগ ও তিনটি দাবি পেশ করা হলেও কার্যকর প্রতিকার দৃশ্যমান হয়নি বলে জানান জামায়াত সেক্রেটারি। তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাইরুজ ইসলামের বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করা হলেও তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়নি। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের বাধা দেওয়া হয়েছে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। একজন নারী ভোট দিতে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সনাতন সম্প্রদায় ও সরকারি চাকরিজীবী ভোটারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে কাজ করলে চাকরিতে সমস্যার মুখে পড়তে পারেন—এমন ইঙ্গিত দিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। দলের নেতা-কর্মীদের মারধর করা, নারী ভোটারদের বাধা দেওয়া ও নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
জামায়াত সেক্রেটারি অভিযোগ করেন, কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র বা পরিচয় শনাক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যাজ দেখা যায়নি। এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে কোনো কোনো কর্মকর্তা যথাযথ পরিচয়পত্র দেখাতে পারেননি। কয়েকটি ব্যালট বইয়ের মুড়িতে আগাম সিল ও স্বাক্ষর করে রাখা হয়েছে। এতে জাল ভোটের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ভোটারকে ব্যালট দেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিল ও স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ার কথা।
গোলাম পরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, কিছু নির্বাচনী এলাকায় অর্থ বিতরণও করা হয়েছে। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পরিচয় ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাসহ এসব ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনী থাকলে ভোটারদের নিরাপত্তা, জাল ভোট প্রতিরোধ এবং ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। একটি উপনির্বাচনেই যদি অনিয়মের অভিযোগ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন কীভাবে নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে, এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ব্রিফিংয়ে আরও ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য আতাউর রহমান সরকার।
ভোটের দিন লিফলেট বিতরণ, জামায়াত নেতাকে দণ্ড
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে লিফলেট বিতরণের অভিযোগে জামায়াতের এক নেতাকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত মো. আব্দুল করিম ওই ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি।
নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির বিচারক এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ সাদিয়া আফসানা রিমা বলেন, নির্বাচনের আগে শেষ ৪৮ ঘণ্টায় লিফলেট বিতরণের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু একটি প্রার্থীর পক্ষে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছিল। এ ছাড়া প্রার্থীর এজেন্টের কার্যালয়েও লিফলেট পাওয়া যায়। এ সময় বিপুল পরিমাণ লিফলেট জব্দ করা হয়।
সাদিয়া আফসানা রিমা বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে মো. আব্দুল করিমকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে দুই নারী বিএনপি-সমর্থকের কাছেও লিফলেট পান বিচারক। পরে তাঁদের মৌখিকভাবে সতর্ক করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
