ইয়েমেন উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা কেন গুরুত্বপূর্ণ

✍︎ দ্য গার্ডিয়ান ✍︎

সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে হারিয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। এর মাধ্যমে বাব আল-মানদেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক নৌপথ ইরান ও তার মিত্রদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে চলে গেল।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুতিদের এই সামরিক অগ্রযাত্রার ফলে ইয়েমেনে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ দিন পর ইরান সমর্থিত হুতি ও সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যে তীব্র লড়াইয়ে হাজারের বেশি মানুষ হতাহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের চলমান যুদ্ধই এই সংঘাতের মূল কারণ, তবে এর নেপথ্যে রয়েছে ইয়েমেনে বহু বছরের পুরোনো গৃহযুদ্ধ।

ইয়েমেন যুদ্ধের মূল পক্ষ ও পেছনের শক্তি
ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের প্রধান দুটি পক্ষ হলো- ইয়েমেন সরকার ও তাদের মিত্রবাহিনী এবং অন্যদিকে হুতি আন্দোলন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণের সমুদ্রবন্দরগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। ইয়েমেনের এই সরকারকে সমর্থন জোগাচ্ছে মূলত সৌদি আরব এবং তাদের নেতৃত্বাধীন আরব জোট। গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তারা দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে আসছে।

অন্যদিকে, রাজধানী সানাসহ দেশটির পশ্চিমাঞ্চল হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এই শিয়া গোষ্ঠীটি ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘রেজিস্ট্যান্স অ্যাক্সিসের’ অংশ, যার মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে। আদর্শগতভাবে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্রের সহায়তা পেলেও, হুতিরা নিজেদের নীতি নির্ধারণে স্বাধীন।

সাম্প্রতিক দিনে কী ঘটছে
গত সপ্তাহে হুতিরা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল বাব আল-মানদাব প্রণালির ওপর কৌশলগত আধিপত্য বিস্তার। এর জবাবে সরকারি বাহিনী আল-জাউফ, আল-বায়দা, তাইজ ও হুদায়দাহে অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করলে একাধিক ফ্রন্টে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইয়েমেন সরকার হুতিদের কাছ থেকে রাজধানী সানা পুনরুদ্ধারে পাল্টা অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। জবাবে মঙ্গলবার সৌদি আরবের কয়েকটি জ্বালানি কেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুতিরা। এতে অন্তত ৭৩ জন আহত হন। তেল শোধনাগারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। পরদিন ইয়েমেনে ৫০টিরও বেশি বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া শান্তিচুক্তির পর এটিই ইয়েমেনে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ।

এরপর গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার পশ্চিম উপকূল ধরে দ্রুত দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে হুতিরা। তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী ‘মোখা’ ও বাব আল-মানদেব প্রণালির ‘পেরিম দ্বীপ’ দখলে নেয়। সরকারি বাহিনীর জোরালো পাল্টা আক্রমণ না থাকায় পুরো প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করার মতো সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে যায় হুতি বিদ্রোহীরা।

বাব আল-মানদেব প্রণালে কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ব বাণিজ্য ও নৌপরিবহনের জন্য বাব আল-মানদেব অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি রুট। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এবং ইরান ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে এই বাব আল-মানদাবের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।

লোহিত সাগরের এই রুট সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য এখন একমাত্র লাইফলাইন। হুতিরা যদি এই প্রণালির পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয়, তবে তারা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারবে, অথবা  শুল্ক আদায় করতে পারবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি ইরান ও তার মিত্রদের হাতে চলে যাবে।

কীভাবে শুরু ইয়েমেন যুদ্ধ
২০১৪ সালে রাজধানী সানায় জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর প্রতিবাদে আয়োজিত গণমিছিলে হুতি সমর্থকদের ওপর গুলি চালানো হলে এই গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এর পরপরই হুতিরা সানা দখল করে এবং ২০১৫ সালের মধ্যে সরকার উৎখাত করে।

ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পক্ষে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আরব জোট ইয়েমেনে বিমান হামলা শুরু করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রাণহানির কারণে ওই হামলা বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচিত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে দক্ষিণের বন্দরনগরী ‘এডেন’কে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হলেও সানা এবং উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের অধিকাংশ এলাকা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়।

যুদ্ধের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সৌদি আরব ও তাদের মূল সহযোগী সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে সরকারি জোটটি বিভক্ত হয়ে পড়ে। ইউএই মূলত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ (এসটিসি) এবং জয়েন্ট ফোর্সেসকে সমর্থন দিতে শুরু করে। এই সুযোগে দেশের পূর্বে আল-কায়েদা তাদের অবস্থান শক্ত করে এবং এসটিসি ইয়েমেনকে বিভাজনের দাবি তোলে।

যুদ্ধ চূড়ান্ত অচলাবস্থায় পৌঁছালে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে কোনো সমাধান না পেয়ে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় যুদ্ধরত পক্ষগুলো। এই শান্তি চুক্তি দুইবার বাড়ানো হয় এবং গত সপ্তাহ পর্যন্ত ইয়েমেনের পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল।

শান্তি প্রক্রিয়া কেন ভেস্তে গেল
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই শান্তি চুক্তি চাপের মুখে পড়ে। ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। জাতিসংঘ কমিটি একে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

গাজাবাসীর প্রতি সংহতি জানিয়ে হুতিরা লোহিত সাগরে ইসরায়েলমুখী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো শুরু করে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে খুব সহজেই বাব আল-মানদাব প্রণালিতে প্রভাব বিস্তার করতেও সক্ষম হয়।

হুতিদের এই পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র লোহিত সাগরে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়, যা ইয়েমেনের ভেতরের যুদ্ধবিরতিকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। তবে এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে ও নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে হুতিদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়।

নিজেদের শক্ত অবস্থান দেখে হুতিরা সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে গড়িমসি শুরু করে। গত জুলাইয়ে ইয়েমেন সরকারের প্রতিবাদ তোয়াক্কা না করে একটি ইরানি বিমান সানা বিমানবন্দরে অবতরণ করলে সৌদি আরব সেখানে বিমান হামলা চালায়। জবাবে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে হুতিরা।

যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয় ও ভয়াবহতা
দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধ, বিশেষ করে সৌদি জোটের বোমাবর্ষণ ইয়েমেনকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। ২০১৪ সাল থেকে কেবল সরাসরি যুদ্ধে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মারা গেছেন। আর ক্ষুধা ও মহামারিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও কয়েক লাখ মানুষ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এক কোটি ৮২ লাখেরও বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।

বর্তমান লড়াই সেই সংকটকে আরও বাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এক হাজারের বেশি মানুষ হতাহত হয়েছেন। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *