জুলাইয়ে গুলির নির্দেশদাতারা প্রশাসনিক দায়িত্বে বহাল

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমাতে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুলির নির্দেশ দেওয়া বিতর্কিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

যাদের বিচারের আওতায় আনার কথা ছিল, উল্টো তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ দফতরে নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের সূত্র থেকে প্রাপ্ত ৯৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তালিকা এবং তাদের বর্তমান পদায়ন বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানের সময় মাঠে থেকে এই কর্মকর্তারাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলির নির্দেশ দিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেখ হাসিনার পতনের আগে জুলাইয়ের ক্র্যাকডাউন সফল করতে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত অথবা তৎকালীন ক্ষমতাসীনের অনুগত কর্মকর্তারা ছিলেন অনেকটা বেপরোয়া। এদের বেশির ভাগকে অনেকটা বাছাই করে নামানো হয়েছিল আন্দোলন দমাতে। গোয়েন্দা সংস্থার ‘ইতিবাচক’ রিপোর্টের ভিত্তিতে এই বিশেষ কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে তখন রাস্তায় নামায় সরকার। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর তাদের অনেকেই রাতারাতি খোলস বদলে বর্তমান সরকারের আমলেও বাগিয়ে নিয়েছেন প্রভাবশালী সব পদ।

এদিকে বিচারের পরিবর্তে এমন পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থেকে আন্দোলন করা ব্যক্তি ও তাদের স্বজনরা। তারা দ্রুত ট্রাইব্যুনাল করে দোষী কর্মকর্তাদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক, একইসঙ্গে উদ্বেগজনক। জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের যারা গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন তাদের তো বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা এখন ভালো ভালো পদে বসে আছেন। সরকারকে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে আমলাতন্ত্রসহ প্রশাসনের যে বা যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় অন্যায় কাজে জড়িত ছিলেন, তদন্ত করে তাদের মধ্যে দোষীদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় এমন বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবারও ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটাবে।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দাপট

মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সারোয়ার (তালিকার ৫৬ নম্বর)। জুলাই আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১, ৪ এবং ৫ আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৯ হিসেবে বহাল আছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনি রাষ্ট্রপতির প্রটোকল অফিসার এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এপিডি (অ্যাপয়েন্টমেন্ট, পোস্টিং অ্যান্ড ডেপুটেশন) অনুবিভাগে কর্মরত ছিলেন।

নিকারুজ্জামান (তালিকার ৫৭ নম্বর)। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই উপসচিব ২০, ২১, ২৩, ২৬, ২৭ এবং ৩০ জুলাই রামপুরাসহ বিভিন্ন সহিংস এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে ছিলেন। তার বাবা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ছোট ভাই দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এর আগে কক্সবাজারের উখিয়ার ইউএনও থাকাকালীন বিতর্কিত ‘রাতের ভোটে’ সহায়তার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এস এম মুনিম লিংকন (তালিকার ৭৭ নম্বর) ও মো: আক্তারুজ্জামান (তালিকার ৮৫ নম্বর)। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই দুই সিনিয়র সহকারী সচিব যথাক্রমে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এবং ১ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন।

জনপ্রশাসনে বহাল তারা

মোছা. আকলিমা বেগম (তালিকার ১ নম্বর)। আন্দোলনের সময় ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার থাকা এই কর্মকর্তাকে ৫ আগস্টের পর কৌশলগত কারণে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে বদলি করা হয়। সম্প্রতি তাকে সচিবালয়ে পদায়ন করা হয়েছে।

মইন উদ্দিন ইকবাল (তালিকার ৬০ নম্বর) ও আলমগীর কবীর (তালিকার ৫৫ নম্বর)। এই দুই উপসচিব যথাক্রমে ৪ আগস্ট ঢাকা এবং হানিফ ফ্লাইওভার ও শনির আখড়ার মতো তীব্র সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে দুজনেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বহাল আছেন।

বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হককে ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসআপে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি।

রামপুরায় ২৭৯ রাউন্ড গুলির নির্দেশদাতা আইসিটি বিভাগে

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রামপুরা টিভি ভবন এলাকায় নির্বিচারে ২৭৯ রাউন্ড গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া ঢাকা ডিসি অফিসের বিতর্কিত সহকারী কমিশনার সায়েম ইমরান বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব।

সূত্র মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ভোল বদলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে সচিবালয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য, বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন

সচিবালয়ের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী মন্ত্রণালয়েও এই তালিকার একাধিক কর্মকর্তা প্রেষণে বা পদায়নে বহাল আছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন তিনজন বিতর্কিত কর্মকর্তা। এর মধ্যে তালিকার ৫৩ নম্বরে থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব স্নেহাশীষ দাশ ১ থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় এবং ৬৮ নম্বরে থাকা উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ ২০ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তালিকার ৮৪ নম্বরে থাকা খন্দকার রবিউল ইসলাম ২০ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত টানা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও বসেছেন দুই বিতর্কিত কর্মকর্তা। নতুন পদায়ন হওয়া বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খানের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শেখ শামসুল আরেফিন (তালিকার ৮০ নম্বর), যিনি ৪ ও ৫ আগস্ট ইসিবি চত্বর এবং রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় গুলির নির্দেশদাতার দায়িত্বে ছিলেন। একই মন্ত্রণালয়ে কর্মরত সিনিয়র সহকারী সচিব মেহেদী হাসান (তালিকার ৪৮ নম্বর) ২০ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালন করেন।

অর্থ বিভাগেও পুনর্বাসিত হয়েছেন তালিকায় থাকা তিন কর্মকর্তা। এর মধ্যে সিনিয়র সহকারী সচিব সৈয়দ আশরাফুজ্জামান (তালিকার ৭৬ নম্বর) জুলাইয়ের ২০ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত এবং দেবাংশু কুমার সিংহ (তালিকার ৬৪ নম্বরের সিনিয়র সহকারী সচিব) আগস্টের ১ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্বরত ছিলেন। এছাড়া অর্থ বিভাগের উপসচিব মাসুদ রানা (তালিকার ৬১ নম্বর) ৪ এবং ৫ আগস্ট মতিঝিল ও হানিফ ফ্লাইওভার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘাতের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মাঠে ছিলেন।

মাঠ প্রশাসনেও ডিসি অফিসের কর্মকর্তারা

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মোট ৫১ জন কর্মকর্তা সরাসরি মাঠে নিয়োজিত ছিলেন। সরকার পতনের পর তাদের অনেককেই ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও এখনো তারা ঢাকা ও আশেপাশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত পদে (ইউএনও এবং এসি ল্যান্ড) বহাল আছেন।

এদের মধ্যে ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) পদে রাফে মোহাম্মদ ছড়া (আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মৌসুমী নাসরিন (মানিকগঞ্জ সদর), উমর ফারুক (কেরানীগঞ্জ, ঢাকা), মনিষা রানী কর্মকার (শিবালয়, মানিকগঞ্জ) আছেন।

আর এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার-ভূমি) পদে সাদিয়া আক্তার (নারায়ণগঞ্জ সদর), আসিফ রহমান (নবাবগঞ্জ, ঢাকা), শাইখা সুলতানা (শিবচর, মাদারীপুর) কর্মরত আছেন। এছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আবদুল্লাহ আল রনী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আছেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার‌্যালয়ে বহাল আছেন শরীফ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ও নুসরাত নওশীন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *