✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করা প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী কৃষি খাতে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা আনুমানিক ২ লাখ ৮ হাজার ৭৩৫ জন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) চট্টগ্রাম বিভাগের তথ্য দিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি- এই পাঁচ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সংখ্যা প্রায় ৮৪৬টি। যার মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন সড়ক ২১টি। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৫৫ কিলোমিটার। আর এপ্রোচ রোডসহ ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ-কালভার্টের সংখ্যা প্রায় ২৩৫টি। এসব মেরামতে আনুমানিক ব্যয় হবে প্রায় ৪২৩ কোটি টাকা।
বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই এমন সড়কগুলোর মেরামতকাজ চলমান আছে এবং আগামী দু-এক মাসের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মহাসড়কের পরিমাণ ২১২ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার, পাশাপাশি পাঁচটি ব্রিজ ও একটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার সড়কে শুরুর দিকে প্রায় ৪০০ মিটার অংশ পানিবন্দি থাকায় যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিল, তবে বর্তমানে তা স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
চট্টগ্রামের সঙ্গে পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজারের আন্তঃজেলা সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়েছে, শুধু বান্দরবান থেকে রাঙামাটি পথে বৃষ্টির কারণে সমস্যা চলমান আছে, যা আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে সমাধানের আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। রেল চলাচল স্বাভাবিক আছে বলেও জানান তিনি।
মৎস্য খাতে প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, ২৩ হাজার ৬১০টি পুকুর, দিঘি বা খামার এবং ৭৮৯টি মাছের ঘের প্লাবিত হয়েছে। এই খাতে আনুমানিক অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ২১০ কোটি টাকা বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাতামুহুরী উপজেলা। রাঙামাটি জেলায় বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি ও কাপ্তাই। খাগড়াছড়ি জেলায় দীঘিনালা, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি সদর, পানছড়ি ও মাটিরাঙ্গা। বান্দরবান জেলায় বান্দরবান সদর, নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও রুমা উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি গৃহনির্মাণ ও সংস্কার অনুদান দেওয়া হবে। প্রান্তিক ও অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে ভিজিডি, ভিজিএফ ও কর্মসৃজন কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হবে, পাশাপাশি সহজ শর্তে কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্ট শুধু মেরামত নয়, ভবিষ্যতে বন্যা মোকাবিলার উপযোগী আধুনিক প্রযুক্তিতে পুনর্নির্মাণ করা হবে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র আগামী ১৭ জুলাই থেকে খুলে দেওয়া হবে। রাঙামাটির পর্যটনকেন্দ্র এরই মধ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে এবং খাগড়াছড়ির সব পর্যটনকেন্দ্র খোলা আছে। বন্যাকবলিত এলাকায় জুলাই মাসের এনজিও ঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত রাখতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মাধ্যমে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। আগস্ট থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (ওএমএস) এক মাস এগিয়ে এই মাস থেকেই শুরু করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রামীণ সড়কের। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চারটি উপজেলা এবং উত্তর চট্টগ্রামের তিনটি উপজেলায় সড়ক বেশি ভেঙেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে ডুবে থাকা এবং স্রোতের কারণে সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ৯ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলা এবং মহানগরের বিভিন্ন স্থানে বন্যা দেখা দেয়।
সবচেয়ে বেশি সময় ধরে বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে ছিল সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও লোহাগাড়া উপজেলা। এ ছাড়া উত্তর চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) গ্রামীণ সড়কের দেখভাল করে। বন্যার পানি নামার পর থেকে তারা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিচ্ছে। আজ বুধবার পর্যন্ত ৫৮২টি সড়ক ভেঙে যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে এসেছে। এসব সড়কের মোট ৩৯১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনোটির কার্পেটিং উঠে গেছে, কোনোটি মাঝখানে ভেঙে গেছে। আবার কোনোটির সিমেন্টের ঢালাই তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া কোনো কোনো কাঁচা সড়ক একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মাঝে মাঝে ভেঙেছে বেশিরভাগ সড়ক।
এলজিইডি চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন জানান, এখন পর্যন্ত তারা ৫৮২টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পেয়েছে। সড়কগুলোর ৩৯১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সড়কের এই সংখ্যা আরও কিছুটা বাড়বে। সন্দ্বীপ, হাটহাজারীসহ কয়েকটি উপজেলার সড়ক এখনো জোয়ার কিংবা বন্যার পানির নিচে রয়েছে।
এলজিইডি কার্পেটিং সড়ক, এইচবিপি (হট বিটুমিনাস পেভমেন্ট সড়ক), রিইনফোর্সড সিমেন্ট কনক্রিট ব্রিক ফ্ল্যাট সোলিং সড়ক এবং গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা নির্মাণ করে থাকে। উপজেলা সদর, ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং গ্রামের মধ্যে এসব সড়ক নির্মাণ করে থাকে এলজিইডি।
সাতকানিয়ায় মোট ৪০টি সড়কের ২৫ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাঁচটি। ছয়টি সড়ক পুরোপুরি মাঝখান থেকে ভেঙে গিয়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে জানান, এখনো পুরোপুরি জরিপ শেষ হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সংখ্যা আরও বাড়বে। এখন পর্যন্ত আনুমানিক ১৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সাতকানিয়ার মতো বাঁশখালীতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখানে সাত দিনের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন এলাকা পানিতে ডুবে ছিল। আজও বাহারছড়া ইউনিয়নে পানি রয়েছে। তবে গণ্ডামারা, পুঁইছড়িসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে।
উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইফরাদ বিন মুনীর জানান, আজ পর্যন্ত ৬০টি সড়কের ১১০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ অনেক এলাকা থেকে এখনো পানি নামেনি। শুধু সড়ক নয়, কালভার্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন্যায়। পুরো জেলায় প্রায় ১৮০টি কালভার্ট কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনোটি আংশিক আবার কোনোটি পুরোপুরি ভেঙে গেছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন জানান, প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি ১৮০ কোটি টাকার মতো নির্ধারণ করা হয়েছে। সবগুলো হিসাব পাওয়া গেছে। এটা আরও বাড়বে।এরই মধ্যে মেরামতকাজ শুরু হয়েছে। যেসব সড়ক পুরোপুরি বন্ধ, সেগুলো চালু করাই প্রথম লক্ষ্য।
