সব মিত্রকেই হারিয়েছেন ট্রাম্প

✍︎ রাফায়েল বেহর ✍︎

ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অথচ একজন ব্যর্থ প্রেসিডেন্ট জেতার ভান করে চলেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আধিপত্যের এখন গোধূলিলগ্ন। যুক্তরাষ্ট্র এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দেশ। তাদের এই অবস্থান পুরোপুরি নিরাপদ। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আইনকানুনকে অবজ্ঞা করেন। একটি মেরুদণ্ডহীন কংগ্রেসের প্রশ্রয়ে তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সংবিধানের সীমার চেয়েও বেশি ক্ষমতা ভোগ করছেন।

এমন সব সুবিধা থাকার পরও একজন মানুষকে কতটা অযোগ্য হতে হয়! ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এখনো দুই বছরের বেশি বাকি। অথচ এখনই তাকে এতটা পর্যুদস্ত ও অক্ষম দেখাচ্ছে। এর জন্য সত্যিই বিশেষ এক অযোগ্যতা দরকার। ইতিহাস ইরান যুদ্ধকে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের ভাগ্যের এক মোড় ঘোরানো অধ্যায় হিসেবে মনে রাখবে। জাতীয় মর্যাদায় এটি একটি ভয়ানক আঘাত হিসেবেও লেখা থাকবে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করতে এক দুঃসাহসিক সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল। এরপর অহংকারে মেতে ওঠেন ট্রাম্প। তিনি বিশ্বাস করতেন, মধ্যপ্রাচ্যেও এমন দ্রুত বিজয় পাওয়া সম্ভব। তেহরান সরকারের পতন ঘটানো হবে। এরপর দেশটির খনিজ সম্পদ আমেরিকার হাতের মুঠোয় চলে আসবে।

ছয় মাস পর দেখা যাচ্ছে, ইরান এখন নতুন প্রজন্মের কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলার পরও তারা টিকে আছে। এই টিকে থাকার ক্ষমতা তাদের সাহসী করেছে। শান্তির শর্ত হিসেবে তারা এখন ওয়াশিংটনের কাছে আর্থিক ছাড় দাবি করছে। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায়ের অধিকার চাইছে।

যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। শুধু এর তীব্রতা কমেছে। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি প্রায় পতনের দ্বারপ্রান্তে। তিনি ‘ডি-ডে’ বা চূড়ান্ত আঘাত হানার মতো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটিকে খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৌ-হামলার রূপক ব্যবহার করে তিনি আরেকটি আর্থিক চাপ প্রয়োগ করতে চাইছেন। আগের নিষেধাজ্ঞাগুলো যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে নতুন এই কৌশল সফল হবে বলে তিনি মনে করেন।

কেবল ইউরোপেই নয়, অন্যান্য অঞ্চলে—যেমন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতেও মিত্ররা আমেরিকার প্রতি চরম অসন্তুষ্ট। তারা এমন এক যুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যা তারা শুরু করেনি বা চায়ওনি। তারা আমেরিকার কাছ থেকে আরও নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা আশা করেছিল। তারা কয়েক দশক ধরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে জায়গা দিয়েছে এবং এই অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছে। বিনিময়ে কিছুই না পাওয়ায় আজ তারা হতাশ।

এটি সত্য যে সাধারণ ইরানিরা ভয়াবহ কষ্টে আছে। কিন্তু দমন-পীড়নের কারণে তারা নিজেদের ক্ষোভকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ দিতে পারছে না। অন্যদিকে, মার্কিন ভোক্তারা যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতিতে চরম ক্ষুব্ধ। তারা এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়েও বিভ্রান্ত। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারা নিজেদের এই অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ পাবে।

তেহরানের হিসাবটি পরিষ্কার। তারা মনে করে, অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আমেরিকানদের খুব কম। তাই ট্রাম্পই আগে পিছু হটতে বাধ্য হবেন। এই ধারণাটি বেশ যৌক্তিক। ট্রাম্প দেশের মানুষকে বোঝাতে চান যে তিনি সফল হয়েছেন। যেকোনো বিচারেই এটি পরাজয় হলেও তিনি নিজেকে সফল দাবি করতে চান। একজন অধৈর্য প্রেসিডেন্টের কাছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের চেয়ে এটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ হলে কূটনৈতিকভাবে পিছু হটা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। ট্রাম্প নির্দেশ দিলেও পেন্টাগন এখন সর্বাত্মক সামরিক অভিযানে ফিরতে পারবে না। কারণ ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সময় জাতীয় অস্ত্রভান্ডারের বিশাল অংশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

এখান থেকেই ব্যয় ও সক্ষমতার বৈষম্য প্রকট হয়। ইরান মাত্র কয়েকটি মাইন দিয়েই উপসাগরের জাহাজগুলোকে ভয় দেখাতে পারে। তারা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে ড্রোন দিয়ে নাজেহাল করতে পারে। এসব ড্রোন বানাতে ৫০ হাজার ডলারের কম খরচ হয়। আর ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার থেকে ছোড়া এসব ড্রোনকে লক্ষ্যবস্তু বানানোও কঠিন।

অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনী ও মিত্রদের সুরক্ষায় ব্যবহৃত প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের দাম ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলার। ধারণা করা হয়, এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ছোড়া হয়েছে। ফলে আমেরিকার মজুতে এখন ৮৩০টির কম প্যাট্রিয়ট অবশিষ্ট আছে। এই অস্ত্রসংকটের বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে ইউক্রেন। সেখানে রাশিয়ার অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বেসামরিক নাগরিকদের বাঁচাতে শীর্ষমানের মার্কিন ইন্টারসেপ্টরগুলো খুবই জরুরি।

ট্রাম্প যদি সাধারণ কূটনীতি ব্যবহার করতেন, তবে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের পূর্ব দিকের সীমানা রক্ষায় খরচ মেটাতে রাজি করাতে পারতেন। এটি বৈদেশিক নীতির সাফল্য হিসেবে ধরা হতো। এর ফলে উভয় পক্ষের স্বার্থেই সম্পর্ক নতুন করে ভারসাম্য পেত। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি অন্ধ প্রশংসা দেখিয়েছেন এবং গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ড দাবি করার মতো অবান্তর কথা বলেছেন। এর ফলে ইউরোপের স্বায়ত্তশাসনের পথে হাঁটার এই চেষ্টাকে আর জোটের দায়ভার নেওয়া মনে হচ্ছে না। বরং আমেরিকার বিশ্বাসঘাতকতার হাত থেকে বাঁচার এক কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

কেবল ইউরোপেই নয়, অন্যান্য অঞ্চলে—যেমন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতেও মিত্ররা আমেরিকার প্রতি চরম অসন্তুষ্ট। তারা এমন এক যুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যা তারা শুরু করেনি বা চায়ওনি। তারা আমেরিকার কাছ থেকে আরও নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা আশা করেছিল। তারা কয়েক দশক ধরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে জায়গা দিয়েছে এবং এই অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছে। বিনিময়ে কিছুই না পাওয়ায় আজ তারা হতাশ।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প আচমকাই দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে একটি যৌথ সামরিক মহড়া সংক্ষিপ্ত করেন। দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ায় আমেরিকার এক বিশ্বস্ত মিত্র। সিউলের মতে এর যৌক্তিক কারণ হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে মার্কিন বাহিনী বেশি ব্যস্ত। কিন্তু ট্রাম্প একে উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক কিম জং উনের প্রতি এক বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিমের শাসনব্যবস্থাকে তিনি ‘হুমকিহীন ও শ্রদ্ধাশীল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

এক ভয়ংকর স্বৈরশাসনের প্রতি এত বেশি ভদ্রতা দেখালেও কানাডার মতো একটি শান্তিকামী গণতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। উত্তরের এই প্রতিবেশীকে ট্রাম্প অর্থনৈতিক সুযোগসন্ধানী হিসেবে উড়িয়ে দেন। এটিকে ঠিকমতো একটি দেশ বলেও মানতে চান না। তার চোখে এটি একটি ভুল নামের ভূখণ্ড, যা আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়া উচিত।

এ ধরনের মনোভাবের কারণে সম্পর্ক খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক। গত সপ্তাহে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বাণিজ্য আলোচনা থেকে সরে আসেন। তিনি জানান, মার্কিন আলোচকরা শেষ মুহূর্তে অযৌক্তিক দাবি তুলছিলেন। এর জবাবে ট্রাম্প শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেন। কানাডিয়ানরাও এর বদলায় ‘প্রতি ডলারের সমান’ পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

একটি বাণিজ্যযুদ্ধে ছোট অর্থনীতির দেশগুলোরই বেশি ক্ষতি হওয়ার কথা। কিন্তু কার্নির কাছে বাণিজ্য কমার ক্ষতির চেয়েও রাজনৈতিক ক্ষতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ট্রাম্পের হুমকিতে মাথা নত করলে দেশে যে রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বেন, সেটির হিসাব করেছেন। তিনি জানেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামান্য ছাড় পেলেও ভবিষ্যতে আরও বড় দাবি নিয়ে হাজির হন। তিনি আরও জানেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি সিনেটও তাদের হাতে যেতে পারে।

নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ফল হলেও ট্রাম্প দমে যাবেন না। বরং তিনি সেই ফলের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলবেন। কিন্তু ভোটের বাক্সে ব্যর্থতার অকাট্য প্রমাণ হয়তো কিছু রিপাবলিকানকে জাগিয়ে তুলতে পারে। বর্তমানে তারা অন্ধভাবে এক সেনাপতির বাধ্য হয়ে আছেন। অথচ তার শাসনব্যবস্থা দলটিকে অজনপ্রিয় করে তুলেছে এবং দেশকে বন্ধুহীন করেছে।

প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সাংবিধানিক ব্যবস্থাগুলো যদি আংশিকভাবেও কাজ করা শুরু করে, তবুও অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়ার জাদুকরী ঘোর ভেঙে যাবে। একসময় ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বের যে মোহ তাঁকে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তির রূপ দিয়েছিল, তা আজ কেবল একদল চাটুকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যে প্রশাসন নিজেদের জাতীয় বিপ্লব হিসেবে তুলে ধরেছিল, তাদের এখন লুটেরা সামরিক জান্তার মতো মনে হচ্ছে। বিদায়ঘণ্টা বাজছে দেখে তারা নিজেদের পদের সুযোগ নিয়ে যা পারছে লুটে নিচ্ছে।

প্রেসিডেন্টের এখনো সারা দেশে অনুসারী রয়েছে। একটি কট্টর গোষ্ঠী তার প্রতি অটল ভক্তি দেখিয়ে যাচ্ছে। তবে তাদের অনেকেই নিশ্চিতভাবে লক্ষ্যের এই অবক্ষয় বুঝতে পারছে। যার হাতের সব অস্ত্র শেষ হয়ে আসছে, তার ভেতরের আতঙ্কের গন্ধও তারা ঠিকই টের পাচ্ছে।

ট্রাম্পের রাজত্ব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আমেরিকান ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে থাকায় তিনি এখনো অনেক ক্ষতি করতে পারেন। কিন্তু বাকি বিশ্ব তার এই অস্থিরতা বুঝতে শিখেছে। খামখেয়ালি আচরণের পূর্বাভাস পেয়ে তারা নিজেদের মতো করে পথ চলছে। অন্ধ আনুগত্যের যুগ শেষ হয়ে গেছে। ডুবতে থাকা তারার নিভু নিভু আলোয় এখন ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করার সময়।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *