✍︎ কক্সবাজার প্রতিনিধি ✍︎
কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুমনকে গ্রেফতার করে থানায় আনা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।
শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মেরিনড্রাইভ লাগোয়া রিসোর্টটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, অগ্নিকান্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া এ ঘটনায় আহত ৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। ফায়ারসার্ভিসের দুটি ইউনিটের তৎপরতায় উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়। মরদেহগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৯ জনের পরিচয় মিলেছে। এর মধ্যে এক পরিবারের ৬ জন রয়েছেন। তারা হলেন, ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ।
পরিচয় পাওয়া নিহত অন্য তিনজন হলেন ঢাকার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), জিহাদ হাওলাদার ও আকিবুল ইসলাম। শেষ দুজনের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানান, কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, আজ সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। চারজন ব্যক্তি মারা গেছেন তিনতলার দুটি শৌচাগারে।
তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।
উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ওই রিসোর্টে আশিকুলের পরিবারের ৯ সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি তিনজন হাসপাতালে ভর্তি।
বেলা ১১টার দিকে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, ওই রিসোর্টে ২৭ জনের এন্ট্রি ছিল, এর মধ্যে ৯ জন রিসোর্টের বাইরে ছিলেন। উদ্ধার তৎপরতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয়।
দুপুরে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোরশেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা প্রথম দিকে ছয়টি মরদেহ উদ্ধার করেছি। এছাড়া আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। এর মধ্যে দু’জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে আরো চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ, দুইজন নারী ও এক শিশু রয়েছে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, হতাহতরা সবাই পর্যটক ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে- রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত। কারণ অনুসন্ধানে এরই মধ্যে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ঝুঁকিপূর্ণ বলে নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস
কক্সবাজারে আগুনে পুড়ে ছাই হওয়া টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁটি ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।
ডিজি আরও জানিয়েছেন, রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে গত জুনে সতর্ক করার পাশাপাশি নোটিশও দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। তবে এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু ছিল।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর কাজী আলাউদ্দীন রোডে অবস্থিত ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে শারদীয় দুর্গোৎসবে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক।
ডিজি আরও জানান, রিসোর্টটি পরিচালনার জন্য ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে কোনো লাইসেন্স নেয়নি। গত ১১ জুন ফায়ার সার্ভিসের একজন পরিদর্শক সেখানে গিয়ে ই-ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার জন্য ২১ দিনের সময় দিয়ে নোটিশ দেন।
মহাপরিচালক আরও জানান, রিসোর্টটি ঝুঁকিপূর্ণ বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, ‘কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অনেক ইকো রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব স্থাপনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হবে।’
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে রিসোর্ট পরিচালকদের সতর্ক করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি বলেন, ‘তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগুন লাগার কারণ নিয়ে অনুমাননির্ভর কোনো বক্তব্য দেওয়া ঠিক হবে না। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।’
