উদয়নের ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, অভিযুক্ত ঢাবি ডিনের ছেলে

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধীনে পরিচালিত উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রীর ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিকৃত করা, অশ্লীল বার্তা পাঠানো ও ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একই শ্রেণির শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।

এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় ১০ শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অংশগ্রহণ স্থগিত করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। 

শিক্ষার্থীরা বলছেন, তদন্তের নামে অভিযুক্তকে অপহরণ ও গুরুতর মারধরের অভিযোগসংবলিত একটি কাগজে তাদের জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। আপত্তি জানালে জিডি ও আইনি ব্যবস্থার হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া এক ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিবারকে অভিযুক্তের মা ও পরিবারের সদস্যরা বাসায় গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন এবং অন্য ভুক্তভোগীদের পরিবারকেও চাপ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে তারা।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, তদন্তের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে রাখা হয়েছে। তাদের কোনো শিখন ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করে দেওয়া হবে। 

তদন্ত কমিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনাস্থার বিষয়টি তিনি জেনেছেন জানিয়ে বলেন, ‘আমি আজকেই ভিসি স্যারের কাছে যাব। এ বিষয়ে পুনরায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

মঙ্গলবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিনের ছেলে হওয়ায় শুরু থেকেই পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে বিদ্যালয় প্রশাসন।

সকাল থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে শিক্ষার্থীরা। তবে তাদের আটকে রাখতে শ্রেণিকক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় বলে অভিযোগ করে আন্দোলনকারীরা। পরে তালা ভেঙে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করে তারা। এ সময় ‘হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’, ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই’ এবং ‘ওর বাবা ডিন হলে আমাদের কি বাবা রিকশাওয়ালা?’ এমন নানা স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানায় শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী ও প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের হয়রানি-হুমকি বন্ধ করা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ডিনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে গেলেও বিদ্যালয় প্রশাসন তা গ্রহণ করেনি। উল্টো প্রতিবাদী ১০ শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে লিখিত বক্তব্য নেওয়া, ক্লাস ও পরীক্ষা থেকে বিরত রাখা এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগের পক্ষে ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষিত একটি মুঠোফোনও কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।

বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বরাবর দেওয়া অভিযোগপত্রে ছাত্রীরা জানায়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে তাদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করে আসছে। সম্প্রতি কয়েকজন ছাত্রীর আপত্তিকর ছবি তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং ধর্ষণের হুমকি দেওয়ায় তারা আতঙ্কিত। এর আগে দুইবার অভিযোগ জমা দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী ছাত্রী বলে, ‘আমাকে চার বছর ধরে সে বিরক্ত করছে। একাধিকবার ব্যাড টাচ করেছে। বন্ধুদের কাছে আমার সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেছে। বহুবার শিক্ষকদের বলতে চেয়েছি, কিন্তু সাহস বা আশা পাইনি। আপত্তিকর ছবি তৈরি করে বাইরের স্কুলগুলোতেও শেয়ার করেছে। এ বিষয়ে আমাকে মেসেজ দিয়ে প্রতিদিন অনেকে বিব্রত করছে।’

আরেক ভুক্তভোগী ছাত্রী বলেন, ‘সে (অভিযুক্ত) আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ নিয়ে কথা বলে, অশালীন মেসেজ দিয়ে বিব্রত করে। আমাদের অনেক বন্ধুকে ধর্ষণের হুমকিও দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। এগুলো চাইলেও স্যারদের বলা যায় না। আগেও এ ধরনের বিষয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী মো. জামিল হোসেন বলেন, অক্টোবরের প্রথম দিকে একদিন ক্লাস শেষে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিকৃত ছবি ও সংশ্লিষ্ট বার্তা মুছে ফেলতে বলে তারা। এ সময় তাকে থাপ্পড় দিয়ে সতর্কও করা হয়।

জামিল বলেন, ৭ অক্টোবর অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকারী প্রক্টর বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। পরদিন ৮ অক্টোবর পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষকেরা ১০ শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে লাঞ্চরুমে আটকে রাখেন। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা-৩টা পর্যন্ত তাদের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। এ সময় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জমা দিতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। বরং অভিভাবকদের ডেকে মানসিক চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করে সে।

আন্দোলনকারীরা জানায়, প্রথমে ওই ১০ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা ও ক্লাস থেকে বিরত রাখা হয়। পরে অভিভাবকদের প্রতিবাদের মুখে আলাদা কক্ষে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হলেও শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পূজার ছুটিসহ মোট ২৫ দিন তারা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলে টিসি দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাদের।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেছেন, গত ৭ অক্টোবর তাঁর ছেলেকে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী বের করে নিয়ে প্রথমে পলাশী মার্কেটের ছাদে এবং পরে আজিমপুরে দুটি ভবনের মাঝখানে মারধর করে। এতে তাঁর ছেলের ঠোঁট ফেটে যায় এবং পিঠে আঘাত লাগে। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় পরদিন বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে এবং তাদের আলাদা কক্ষে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এরপর তার ছেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগসংবলিত ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় শুক্রবার শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও জানান তিনি।

তার দাবি, তার ছেলের সঙ্গে অভিযোগকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর একসময় বন্ধুত্ব ছিল। পরে একটি ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডিতে লেখালেখিকে কেন্দ্র করে তাকে ভয়ভীতি দেখানো এবং টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটে। ছেলের বক্তব্য অনুযায়ী, টাকা দেওয়া বন্ধ করে ওই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরই তাকে মারধর করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটি তার ছেলেকেও ডেকেছিল। তবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বর্তমানে তারা ছেলেকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নই। স্কুল কর্তৃপক্ষই বিষয়টি দেখবে। তবে সেখানে যাতে কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে জন্য প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের পাঠিয়েছি। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *