বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠিয়েছে রাশিয়া

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের জন্য পাচার করা হয়েছে। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের অনেককে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষরে বাধ্য করা হয়।

তাদের কেউ নিহত, আহত, বন্দি কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন। ইউক্রেন বিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য তৈরি প্রতিবেদনটি ১৯ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়। ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা তদন্ত করে কমিশন ২৯ দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও তালিকায় রয়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইন, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও উজবেকিস্তানসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুক্তভোগীরা সবাই পুরুষ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছর।

বাংলাদেশি নাগরিকদের রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি সংগ্রহ করেছে তদন্ত কমিশন। এসব ভিসায় রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। নথিতে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বেসামরিক দেখানো হলেও কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের ব্যবস্থার আড়ালে বিদেশি নাগরিকদের রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে। সেখান থেকে তাদেরকে জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নিয়োগকারী এজেন্ট ও সংস্থাগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিত। নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, কারখানার শ্রমিক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হতো। প্রস্তাব বিশ্বাসযোগ্য করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ও অন্যান্য নথি দেখানো হতো। পরে ভিসা, উড়োজাহাজের টিকিটসহ ভ্রমণের ব্যবস্থা করে তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এজেন্টরাও তাদের সঙ্গে রাশিয়ায় যেতেন।

কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেক বিদেশি নাগরিককে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষরে বাধ্য করা হয়। চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা থাকায় অনেকে শর্ত বুঝতে পারেননি। কারও কারও পাসপোর্ট ও  মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করা হয়। একপর্যায়ে তারা জানতে পারেন, প্রতিশ্রুত বেসামরিক চাকরির পরিবর্তে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করতে হবে। প্রতিবেদনে এক বাংলাদেশির স্ত্রীর বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি জানান, তার স্বামীর পাসপোর্ট নিয়ে তাকে চুক্তির বিভিন্ন স্থানে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। চুক্তিটি ছিল শুধু রুশ ভাষায়। প্রচণ্ড চাপের মুখে তার স্বামীর সামনে কার্যত কোনো বিকল্প ছিল না বলে জানান তিনি।

চাকরির আশায় বিদেশে যেতে কেউ কেউ নিয়োগ ফি হিসেবে বিপুল অর্থ দিয়েছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা ঋণ করেছেন বা সম্পদ বিক্রি করেছেন। পরে স্বজনের মৃত্যুসংবাদ পেলেও কোনো কোনো পরিবার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও অনেক পরিবার নির্ভরযোগ্য তথ্য পায়নি। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিয়োগকারী এজেন্টরা অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পরিবারের ফোনও ধরতেন না।

কমিশন জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নিয়োগকারী চক্রের সঙ্গে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের উচ্চমাত্রার সমন্বয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, প্রতারণা, আর্থিক ও সামাজিক দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া এবং জোর করে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানোর মতো কর্মকাণ্ডকে বিদেশি নাগরিকদের পাচার করে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত করেছে কমিশন। এ ধরনের নিয়োগ বন্ধ, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতি এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি, ভুক্তভোগীদের মুক্ত করতে রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রতারণামূলক নিয়োগ ঠেকাতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে সুপারিশ করেছে কমিশন।

জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভনে প্রতারণা করে মানুষকে সশস্ত্র সংঘাতে যুক্ত করার আন্তর্জাতিক চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রকৃত সংখ্যা, নিয়োগকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং নিখোঁজ বা আটকে পড়া ব্যক্তিদের অবস্থান নির্ধারণে আরও তদন্ত ও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়েছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *