✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎
তেহরান ও ওয়াশিংটন উত্তেজনার মধ্যে ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
রোববার (১৯ জুলাই) ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা (এইওআই) এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার তথ্য জানিয়েছে।
এইওআই জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার ভোরে খুজেস্তান প্রদেশের ওই স্থাপনায় কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে মার্কিন বাহিনী। সংস্থাটির দাবি, এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তবে হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।
ইরানে ২০২২ সালে দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। দেশটির দাবি, গত কয়েকদিন ধরে দেশটির বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাচ্ছে, যার জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটির সামরিক-বেসামরিক স্থাপনার লক্ষ্য করে গত এক সপ্তাহ ধরে টানা হামলা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন হামলার জবাবে কয়েকটি আঞ্চলিক দেশে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহার করা সব স্থাপনা ও ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনীও।
দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে আগে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের অবসান এবং স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে গত জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মাঝে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে তেহরানের বাধা দেওয়ার অভিযোগে দেশটিতে নতুন করে হামলা শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রকে এমন শিক্ষা দেওয়া হবে, যা তারা কখনো ভুলবে না
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের হাতে যুক্তরাষ্ট্র এমন শিক্ষা পাবে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বারবার লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।
শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে খামেনির নামে একটি লিখিত বিবৃতি প্রচার করা হয়। সেখানে তিনি বলেন, গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে লঙ্ঘন করেছে, তাতে ট্রাম্পের স্বাক্ষর ‘সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও অবিশ্বাস্য’ বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘চুক্তির ক্ষেত্রে মহাশয়তান বারবার অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আবারও প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য নেই। জুলুম, আধিপত্যবাদ ও বর্বরতা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
খামেনি আরও বলেন, ‘মার্কিন শত্রু যখন যুদ্ধ আরও উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং বড় মূল্য ও অপমানের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন তাদের জানা উচিত, প্রিয় ইরানি জাতি ও প্রতিরোধ ফ্রন্ট তাদের জন্য এমন শিক্ষা প্রস্তুত রেখেছে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না।’
এদিকে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে। ইরানের অভিযোগ, মার্কিন হামলায় সেতু, রেলপথ, সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে তেহরান। এছাড়া ভারত মহাসাগরের উত্তরে অবস্থানরত একটি মার্কিন জাহাজে হামলার দাবিও করেছে তারা।
কুয়েতের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের হামলায় দেশটির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও একটি পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নাগরিকদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে।
খামেনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র তার ‘আসল চেহারা’ প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে দেশটির ‘প্রতারণাপূর্ণ চরিত্র, অবিশ্বস্ততা ও কু-অভিপ্রায়’ স্পষ্ট হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি দেশকে রক্ষায় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান এবং চলমান সংঘাতের মধ্যে জনগণকে সতর্ক ও সক্রিয় থাকারও আহ্বান জানান।
এদিকে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ইরানের সমর্থনে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে-এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
গত মাসে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পরিবেশ তৈরি করা। তবে চুক্তির পর থেকেই উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সমঝোতাকে কার্যত অকার্যকর বলে ঘোষণা করেছে।
