✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎
সোমবার (২২ জুন) দেশটির সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীদের তালিকা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। এছাড়া সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং, সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রায়নারসহ কয়েকজন আলোচনায় রয়েছেন।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
লেবার পার্টির এমপিদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। জনমত জরিপ বলছে, লেবার পার্টির এমপিদের কাছেও তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। প্রায় এক দশক ধরে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বার্নহ্যাম। তার ঝুলিতে দীর্ঘকালের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ জন্য তিনি ‘কিং অব দ্য নর্থ’ হিসেবেও পরিচিত। সবশেষ গত শুক্রবার তিনি পার্লামেন্টের একটি আসনে জয় পান। এর মাধ্যমে তিনি লেবার পার্টিতে নিজের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী পদে লড়াইয়ের জন্য তার অন্তত ৮১ এমপির সমর্থন প্রয়োজন। শুক্রবারের জয়ের মাধ্যমে তিনি পার্লামেন্টে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেছেন। ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত লি আসনের এমপি ছিলেন তিনি। ওই সময়ে কিনির স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন বার্নহ্যাম।
এর আগে আরও দুবার দলীয় প্রধান হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিলেন বার্নহ্যাম। এরমধ্যে ২০১০ সালে এড মিলিব্যান্ড এবং ২০১৫ সালে জেরেমি করবিনের কাছে পরাজিত হন তিনি।
ওয়েস স্ট্রিটিং
২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর ওয়েস স্ট্রিটিং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। গত মে মাসে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এ দায়িত্ব পালনের আগে তিন বছর বিরোধী দলে থাকাকালীন ছায়া স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
স্ট্রিটিং ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টসের প্রেসিডেন্ট এবং লন্ডনের কাউন্সিলর ছিলেন। বর্তমান তাকে দলের বাকপটু ও বিচক্ষণ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এনএইচএসের চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের দীর্ঘ তালিকা কমিয়ে আনাকে তার অন্যতম সাফল্য।
দলের মধ্যপন্থি ও ডানপন্থি এমপিদের মধ্যে তার ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তবে দলের ভেতর ‘ডানপন্থি’ ভাবমূর্তির কারণে সাধারণ সদস্যদের কাছে জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে পারে তার।
অ্যাঞ্জেলা রায়নার
অ্যাঞ্জেলা রায়নার যুক্তরাজ্যের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী রাজনীতিবীদ। তিনি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। এমনকি কোনও শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। রাজনীতিতে তার এ উত্থান অবিশ্বাস্য ঘটনা।
কেয়ার ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করার সময় ‘ইউনিসন’ ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। এটি তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তিনি ২০১৫ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের অ্যাশটন-আন্ডার-লাইন আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
এ সময় তিনি জেরেমি করবিনের ছায়া মন্ত্রিসভায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। ওই সময়ে তিনি ছায়া সরকারের আবাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গৃহনির্মাণ বৃদ্ধি ও ভাড়াটেদের অধিকার আমূল সংস্কারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন।
২০২৫ সালে রায়নার নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ করেন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে একটি বাড়ি কেনার সময় যথাযথ ট্যাক্স পরিশোধ না করার অভিযোগ ওঠে। এরপরই তিনি পদত্যাগ করেন।
যুক্তরাজ্যের এসব হেভিওয়েট নেতা ছাড়াও আরও কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। এরমধ্যে সাবেক জ্বালানি মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডও রয়েছেন। যদিও তিনি এ সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, আমার জন্য সেই অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদও আলোচনায় আছে। তবে অভিবাসন নীতি নিয়ে তার কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ফলে সাধারণ সদস্যদের সমর্থন পাওয়া নিয়ে তার সংশয় রয়েছে। এছাড়া প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী এবং সাবেক রয়্যাল মেরিন কর্মকর্তা আল কার্নসকেও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদের প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এক দশকে ৭ প্রধানমন্ত্রী
লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার নিজ দলের ভেতরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে ব্রিটেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন কনজারভেটিভ পার্টি যে প্রবণতা তৈরি করেছিল, লেবার পার্টির এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত যেন তারই ধারাবাহিকতা।
গত কয়েক মাস ধরে জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা ক্রমাগত তলানিতে ঠেকা এবং নিজ দলের এমপিদের রাজনৈতিক চাপের মুখে সোমবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন স্টারমার। লেবার পার্টির প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যান্ডি বার্নহ্যাম নিশ্চিত করেছেন, স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার লড়াইয়ে নামবেন তিনি।
২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে স্টারমার সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত প্রধান বিরোধী দল টরিরা (কনজারভেটিভ পার্টি) পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন করেছে।
শীর্ষ পদে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই স্টারমার বারবার নেতা বদলের এই অরাজকতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ দুই বছরেরও কম সময়ের মাথায় স্টারমার নিজেও একই ভাগ্যের পরিহাসে পড়লেন। কী ঘটেছিল পূর্বসূরীদের ভাগ্যে?
ডেভিড ক্যামেরন, মে ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের জুলাই
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) সিদ্ধান্ত ক্যামেরনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের অবসান ঘটায়।
২০১৬ সালের জুনের গণভোটে ব্রিটিশ নাগরিকরা ইইউ ত্যাগের পক্ষে রায় দেওয়ার পর ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে প্রচার চালানো ক্যামেরন পদত্যাগ করেন।
থেরেসা মে, জুলাই ২০১৬- জুলাই ২০১৯
ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর ব্রেক্সিট গণভোটের পরবর্তী বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে থেরেসা মে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ব্রেক্সিট আলোচনায় নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পরের বছরই তিনি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কিন্তু তার সেই চাল উল্টো ফল দেয়। তার দল পার্লামেন্টে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলে।
পার্লামেন্টে নিজের ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করাতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৯ সালের মে মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে কনজারভেটিভরা চরম পরাজয়ের মুখোমুখি হয়; যা শেষ পর্যন্ত থেরেসাকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
বরিস জনসন, জুলাই ২০১৯-সেপ্টেম্বর ২০২২
নিয়ম ভেঙে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য পরিচিত ছকভাঙা রাজনীতিবিদ বরিস জনসনকে করোনাভাইরাস মহামারি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের চূড়ান্ত বিদায়ের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগাম সাধারণ নির্বাচনে তিনি কনজারভেটিভদের এক বিশাল জয় এনে দেন।
কিন্তু একের পর এক কেলেঙ্কারিতে দুর্বল হয়ে পড়া জনসন শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের গণ-পদত্যাগের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
লিজ ট্রাস, সেপ্টেম্বর ২০২২-অক্টোবর ২০২২
বিপর্যয়কর কর ছাড়ের ‘মিনি-বাজেট’ পেশ করে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন; যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত।
তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাজারকে আতঙ্কিত করে তোলে এবং যুক্তরাজ্যকে এক আর্থিক ধসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এর ফলে নিজ দলের সমর্থন হারিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন তিনি।
ঋষি সুনাক, অক্টোবর ২০২২-জুলাই ২০২৪
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে স্টারমারের কাছে হেরে কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটানোর আগে সুনাক ২০ মাস দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন।
লিজ ট্রাসের তৈরি করা চরম বিপর্যয়ের পর কিছুটা স্থিতিশীলতা আনলেও টরি দলের ভেতরের তিক্ত কোন্দল থামাতে ব্যর্থ হন তিনি।
ব্যক্তিগতভাবে বিপুল ধন-সম্পদের মালিক এই সাবেক অর্থায়নকারী শেষ পর্যন্ত জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটে ভুগতে থাকা সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে পারেননি।
