দেশের ক্রিকেটে কোকোর অবদান

:: মারুফ মল্লিক ::

আরফাত রহমান কোকোর পরিচয় কি? জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সন্তান। অন্তত এই পরিচয়েই সবাই কোকোকে চেনে। কিন্তু আমরা যারা খেলাধুলা পছন্দ করি, এক আধটু খোঁজ খবর রাখি তাদের কাছে এসব পরিচয়কে ছাপিয়ে কোকো একজন নিরেট ক্রিকেট সংগঠকে পরিনত হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের কর্মপদ্ধতির ছাপ কোকোর মধ্য দেখা যায়। জিয়া নিজ হাতে কাজ করতে পছন্দ করতেন। জিয়া মাইলের পর মাইল হেটেছিলেন। কোদাল নিয়ে খাল খনন করেছেন। জিয়ার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ হচ্ছে তিনি যেখাতে হাত দিয়েছেন সেখানেই সফল হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ, সেনাবাহিনীর চাকুরি বা রাষ্ট্রপতি হিসাবে বঙ্গভবনে অবস্থান সব জায়গাতেই জিয়ার সরব উপস্থিতি ছিল। কথার ফুলঝুরি না ফুটিয়ে কাজ নিয়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতেন। জিয়ার হাত ধরে অনেক নতুন কিছুর শুরু আমাদের দেশে।

কোকোর হাত ধরে আমাদের ক্রিকেটেরও অনেক নতুন কিছু শুরু হয়েছিল। ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য তিনি সঠিক জায়গা থেকেই কাজ শুরু করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ছেলে হিসাবে তিনি বিসিবির প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন। কিন্তু এটা না করে তিরি ক্রিকেট ডেভলপমেন্টের দায়িত্ব নিলেন পরিচালক হিসাবে। তিনি বুঝতে পারছিলেন সম্ভবত, উন্নয়নের কাজটা নিজ হাতে দায়িত্ব নিয়ে করতে হয়। আমাদের চারপাশে এত এত দুর্নীতি পরায়ন ও ফাঁকিবাজ লোকজন আছে যে নিজ হাতে কাজ না করলে কোনো কিছু করা সম্ভব না। ক্রিকেটের দুর্নীতিকে তিনি কঠোরভাবে মোকাবেলা করেছিলেন। বলা যায় কোকো নিজ হাতে দেশের ক্রিকেটর খোলনলচে বদলে দিয়েছিলেন। সভাপতি হলে তিনি এতটা সফল নাও হতে পারতেন। আর ডেভলপমেন্ট কমিটির দায়িত্বে থাকার কারণে তিনি মাঠ পর্যায়ে সরাসরি কাজ করতে পেরেছিলেন। এতে করে তার কর্মঠ ও যোগ্য একটি ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।

যে রাজনীতিকে কোকো একপাশে সরিয়ে রেখেছিলেন সেই কোকো এখন দেশের ক্রিকেকে ব্রাত্য এক নাম। সম্ভবত কোকোর নাম উচ্চারন এখন ক্রিকেটে এক প্রকার নিষিদ্ধই। আজকে যাদের ক্রিকেট থেকে লুটেপুটে নিতে দেখছি এদের অনেকেই কোকোর সময়ও ক্রিকেটে ছিলেন। সুবিধা নেননি একেবারেই বলা যাবে না। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কোকো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন বলে কেউ কেউ সন্দেহ করেন। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হওয়ার পরও তিনি উদ্দিনদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আটক হয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার উপর চাপ সৃষ্টি জন্য উদ্দিনরা কোকোকে আটক করে। তাকে নির্যাতন করারও অভিযোগ আছে। আর অপপ্রচার তো ছিলই। তবে জেল থেকে তিনি আর সুস্থাবস্থায় বের হতে পারেননি। চিকিতসার জন্য বিদেশে গেলেও দেশে আর ফিরতে পারেননি। নিথর দেহে কফিনবন্দী হয়ে ফিরেছিলেন ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে । আজ ২৪ জানুয়ারি আরাফাত রহমান কোকোর ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী।

জিয়াউর রহমানের মতই কোকোকে খেলায় মাঠে ঘাটে দেখা যেত সব সময়। যেই মিরপুরে কেউ যেতে চাইত না সেখানেই তিনি হোম অব ক্রিকেট তৈরি করলেন। ঢাকার বাইরে নতুন স্টেডিয়াম তৈরি করলেন। কোকোদের আমলে ক্রিকেটের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগটা প্রতিযোগীতা পূর্ণ হত। অন্তত এখনকার মত এতটা পাতানো খেলার অভিযোগ ছিল না। অথচ কোকোর নিজের ক্লাব ছিল ওল্ড ডিওএইচএস। সম্ভবত জিএমসিসি কিনে তারা ওল্ড ডিওএইচএস হিসাবে প্রিমিয়ারে খেলতে আসেন। এর পাশাপাশি মোহামেডান, সিটি ক্লাব, সোনারগাঁ ক্রিকেটার্সসহ অনেক ক্লাবই বিএনপিপন্থীদের হাতে ছিল। কিন্তু এসব ক্লাবের একচেটিয়া দাপট দেশের ক্রিকেট, এমনটি ফুটবল বা হকিতেও ছিল না।

দায়িত্বে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কোকো সব শুরু করতে পারেননি। তবে কোকো স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন ক্রিকেটে উন্নতি করা সম্ভব। বাংলাদেশ ক্রিকেট বড় কোনো নাম না। কিন্তু সব দলই টাইগারদের সমীহ করে চলে। এই অর্জন কোকোর হাত ধরেই রচিত হয়েছিল। জাতীয় দল গঠন প্রক্রিয়াকে তিনি একটা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন। খোলোয়ারদের পাইপলাইন তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি যা শুরু করেছিলেন তার সুফল আমরা ২০০৭ এর বিশ্বকাপে দেখেছিলাম। এখনো তার আমলে শুরু করা হাই পারফরমেন্স ইউনিটে তৈরি হওয়া খেলোয়ারদের সেবা নিচ্ছি আমরা। মুশফিক, তামিম, সাকিব, মাহমুদুল্লাহ, মাশরাফির বিকল্প আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি।

একটা জিনিস কি, সব দেশের এসব খেলাধুলার বোর্ডগুলো রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের দেশেও তাই হয় সব সময়। কিন্তু কোকো রাজনৈতিক পরিচয়ে ক্রিকেট বোর্ডে এসে রাজনীতিকে একপাশে সরিয়ে রেখে উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয়কে তিনি গুরুত্ব দেননি। এ কারণেই বিএনপির আমলে সালাউদ্দিনকে ফুটবলের কোচ করা হয়। আরিফ খান জয়কে ফুটবল দলের অধিনায়ক করা হয়। আকরাম খানকে ক্রিকেটের অধিনায়ক করা হয়। কোকো বা বিএনপি প্রমান করেছিল রাজনৈতিক পরিচয় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিবেচ্য হতে পারে না। উল্লেখ্য কোকোর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ক্রিকেটের কাঠামোগত উন্নতি হলেও ফুটবল বা হকির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি ওই সময়। এখানেই কোকোর সাংগঠনিক যোগ্যতার পরিচয় পাওয়া যায়।

যে রাজনীতিকে কোকো একপাশে সরিয়ে রেখেছিলেন সেই কোকো এখন দেশের ক্রিকেকে ব্রাত্য এক নাম। সম্ভবত কোকোর নাম উচ্চারন এখন ক্রিকেটে এক প্রকার নিষিদ্ধই। আজকে যাদের ক্রিকেট থেকে লুটেপুটে নিতে দেখছি এদের অনেকেই কোকোর সময়ও ক্রিকেটে ছিলেন। সুবিধা নেননি একেবারেই বলা যাবে না।

প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কোকো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন বলে কেউ কেউ সন্দেহ করেন। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হওয়ার পরও তিনি উদ্দিনদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আটক হয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার উপর চাপ সৃষ্টি জন্য উদ্দিনরা কোকোকে আটক করে। তাকে নির্যাতন করারও অভিযোগ আছে। আর অপপ্রচার তো ছিলই। তবে জেল থেকে তিনি আর সুস্থাবস্থায় বের হতে পারেননি। চিকিতসার জন্য বিদেশে গেলেও দেশে আর ফিরতে পারেননি। নিথর দেহে কফিনবন্দী হয়ে ফিরেছিলেন ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে । আজ ২৪ জানুয়ারি আরাফাত রহমান কোকোর ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী।

কোকোকে নিয়ে হেন কোনো প্রপাগান্ডা নেই যা বিরোধী পক্ষ করেনি। কিন্তু কোকোর জানাযায় লাখো মানুষের উপস্থিতি ভিন্ন বার্তা দেয়। প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে কোকোকে মুছে ফেলা যায়নি। অবশ্যই একদিন দেশের ক্রিকেটে কোকোকে স্মরণ করা হবে। অনন্ত অসীম থেকে কোকো কি তখন দেখতে পারবেন? নিশ্চয়ই দেখতে পারবেন। কোকোরা স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্নের ভিতরেই বেঁচে থাকেন নিরন্তর।

ড. মারুফ মল্লিকগবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *