বজ্রপাতে আট জেলায় ১৫ জনের মৃত্যু

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

দেশের আট জেলায় কালবৈশাখীর সঙ্গে বজ্রপাতে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, পঞ্চগড়, জামালপুর, নাটোর, ঠাকুরগাঁও ও শেরপুরে এসব ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের ছয় জেলায় ১২ জন নিহত হয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে গাইবান্ধায়। জেলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ও জামালপুরে দুজন করে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বগুড়ায় একজন, পঞ্চগড়ে একজন, নাটোরে একজন ও শেরপুরে একজন নিহত হয়েছেন।

গাইবান্ধা

বজ্রপাতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলায় শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

সুন্দরগঞ্জে নিহতরা হলো উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের দক্ষিণ ধোপাডাঙ্গা গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর আলম সুজা চৌধুরীর ছেলে মো. ফুয়াদ চৌধুরী (৩৩), মো. ছোটন চৌধুরীর ছেলে মো. রাফি চৌধুরী (১১) ও নবীর হোসেনের ছেলে মো. মিজানুর রহমান (২০)। আর আহত হয়েছেন শামীম মিয়া (১৮)। তিনি ওই গ্রামের মো. আবদুল হাই মিয়ার ছেলে।

এ ছাড়া সাঘাটা উপজেলায় নম্বার আলী (৬৫) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।

সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ ও ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. মোখলেছুর রহমান মণ্ডল এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, আজ বিকেলে হঠাৎ আকাশ মেঘে ঢেকে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় ওই দুই তরুণ ও শিশু বাড়ির পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তারা প্রাণ হারায়। একই সময়ে পাশে থাকা একটি গরুও মারা যায়। আহত শামীমকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে, ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চলে মানিক (১৯) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলার ফুলছড়ি ইউনিয়নের জামিরা চরে এ ঘটনা ঘটে। তিনি ওই গ্রামের শুক্কুর আলী প্রামাণিকের ছেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিকেলের দিকে হঠাৎ আকাশে কালো মেঘ জমে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে খোলা চরে থাকা মানিক বজ্রপাতের কবলে পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় তাঁর ঘোড়াটিও মারা যায়।

একই দিনে উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের বুলবুলির চরে বজ্রপাতে আলী আকবর (৪৫) নামে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তিনি ওই এলাকার শীতল মিয়ার ছেলে। প্রতিদিনের মতো গরু চরাতে যান তিনি। এ সময় ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত শুরু হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সিরাজগঞ্জ

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় বজ্রপাতে এক কৃষক ও এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। আজ বিকেলে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত কৃষকের নাম আব্দুল হামিদ (৫০)। তিনি উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের বেত্রাশীন গ্রামের মৃত গফুর আলীর ছেলে।

তাড়াশ থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান বলেন, বজ্রপাতে এক কৃষকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে একই দিন বিকেল ৫টার দিকে রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের মল্লিকচান এলাকায় বজ্রপাতে হাসান শেখ (২৫) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। তিনি ওই এলাকার আব্দুল হালিম শেখের ছেলে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিকেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিজ জমিতে কাটা ধান জড়ো করছিলেন হাসান। এ সময় হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

বগুড়া

বগুড়ার গাবতলীতে মাঠে ছাগল আনতে গিয়ে বজ্রপাতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। আজ বিকেল ৪টার দিকে গাবতলী উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের মুচিখালী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত যুবকের নাম সুমন হোসেন (৩৫)। তিনি মুচিখালী গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে।

পঞ্চগড়

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় চা-বাগানে কাজ করার সময় বজ্রপাতে সোহরাওয়ার্দী (৪০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি পেশায় দিনমজুর। আজ সকাল ৯টার দিকে উপজেলার ধামোর ইউনিয়নের সোনাপাতিলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত সোহরাওয়ার্দী সোনাপাতিলা মাধগজ এলাকার আব্দুস ছামাদের ছেলে। এ ঘটনায় মোস্তফা নামের আরও এক শ্রমিক আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজ সকালে ওই এলাকার একটি চা-বাগানে সোহরাওয়ার্দীসহ তিন শ্রমিক চা-পাতা সংগ্রহের কাজ করছিলেন। সকাল ৯টার দিকে হঠাৎ বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হয়। এ সময় পাশে থাকা মোস্তফা গুরুতর আহত হন। তবে তাঁদের সঙ্গে থাকা আরেক শ্রমিকের কোনো ক্ষতি হয়নি।

জামালপুর

জামালপুরে বজ্রপাতে দুজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মেলান্দহ উপজেলায় রান্নাঘরে কাজের সময় মর্জিনা বেগম (২২) ও সদর উপজেলার চরযথার্থপুরে মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে হাসমত আলী হাসু (৪৫) নিহত হন।

মর্জিনা বেগম উপজেলার হাজরাবাড়ী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম কড়ইচুড়া গ্রামের রাজিবের স্ত্রী। ঘটনার সময় তিনি রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। বজ্রপাত হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় শেফালী (২৮) নামের আরও এক নারী আহত হয়েছেন। তাঁকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

অপর দিকে সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের চরযথার্থপুর গ্রামে হাসমত আলী হাসু (৪৫) নামের এক ব্যক্তি বজ্রপাতে মারা গেছেন। তিনি হাবিব মণ্ডলের ছেলে।

এ ঘটনায় আহত হয়েছেন চারজন। তাঁদের জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থার অবনতি হলে পরে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নাটোর

নাটোরের সিংড়ায় বজ্রপাতে সম্রাট হোসেন (২৬) নামের এক ধানকাটা শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আজ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার ডাহিয়া ইউনিয়নের ঠেংগা পাকুরিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত সম্রাট হোসেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার নগরডালা গ্রামের সাজা ফকিরের ছেলে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে সিংড়া থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, আজ সকালে দলবদ্ধভাবে ধান কেটে বিকেলে সেই ধান সম্রাটসহ আরও কয়েকজন মিলে ওই গ্রামের কৃষক আউয়ালের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে সম্রাট ধানের বোঝা মাথা থেকে নামিয়ে পাশের এক ঘরে আশ্রয় নেন। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে অন্য শ্রমিকেরা তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক সম্রাটকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঠাকুরগাঁও

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। আজ দুপুরে উপজেলার পীরগঞ্জ ইউনিয়নের নিয়ামতপুর ও কোষাডাঙ্গীপাড়া গ্রামে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন—নিয়ামতপুর গ্রামের রশিদুল ইসলামের স্ত্রী লাবণী আক্তার (৩৫) এবং কোষাডাঙ্গীপাড়া গ্রামের আকবর আলীর ছেলে ইলিয়াস আলী (৩৭)।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার সকাল থেকেই পীরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। বেলা পৌনে ২টার দিকে মাঠ থেকে গরুর ঘাস কেটে বাড়ি ফিরছিলেন লাবণী আক্তার। পথে আকস্মিক বজ্রপাতে তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।

অন্যদিকে, একই সময়ে কোষাডাঙ্গীপাড়া গ্রামের ইলিয়াস আলী পার্শ্ববর্তী বৈরামপুর এলাকায় নিজের ফসলি জমি দেখতে যান। এ সময় বজ্রপাত হলে মাঠেই তাঁর মৃত্যু হয়।

শেরপুর

শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বজ্রপাতে এক শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। আজ বিকেলে উপজেলার ধানশাইল ইউনিয়নের পূর্ব চাপাঝোড়া তালতলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত মো. আবুল হাসান (৪০) পূর্ব চাপাঝোড়া তালতলা গ্রামের মো. শাহ আলমের ছোট ছেলে। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক ছিলেন। ধানশাইল ইউনিয়নের চকপাড়া গণশিক্ষা কেন্দ্রে পাঠদান করতেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজ দুপুরে বাড়ির পাশের জমিতে ধান কাটতে যান আবুল হাসান। একপর্যায়ে বজ্রপাতসহ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। এদিকে বিকেল হলেও তিনি বাড়ি ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। জমির পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে এক কৃষক আবুল হাসানকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে তাঁর বাড়িতে খবর দেন। পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *