✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সোমবার রাত ৯টা ২৮ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে এই কম্পন অনুভূত হয়। তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইউরোপিয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি) ভূমিকম্পের তথ্য নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, রিখটার স্কেলে কম্পনটির মাত্রা ছিল ৪।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের ভুলতা ইউনিয়নের মর্তুজাবাদ এলাকায়। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা রুবায়েত কবির।
এদিকে মার্কিন ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীতে ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের পাশে। মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার।
মাঝারি এই কম্পনের ফলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে, বিশেষ করে বহুতল ভবনে অবস্থানরতদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। তবে ভূমিকম্পটি স্বল্পস্থায়ী হওয়ায় এবং উৎপত্তিস্থল অগভীর না হওয়ায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, চলতি জুন মাসে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো কেঁপে উঠল দেশ। এর আগে গত ১১ জুন রাত ৯টা ৪০ মিনিটে দেশে ৪ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। ইউরোপীয় মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের (ইএমএসসি) তথ্যমতে, সেই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের শিলচর এলাকায়, যা সিলেটের করিমগঞ্জ সীমান্তের কাছাকাছি।
এছাড়া গত ৭ জুন রাত ১১টা ৩৭ মিনিটে আরও একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ওই ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ভুটানে এবং সে সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছিল।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ ও তার আশপাশের এলাকা দেশের অন্যতম ভূমিকম্প-সংবেদনশীল অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। কারণ এ অঞ্চলের নিচ দিয়ে মধুপুর ফল্ট, শীতলক্ষ্যা নদীসংলগ্ন গোপন ফল্ট এবং বৃহত্তর ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটের প্রভাব বিস্তৃত রয়েছে।
যদিও রূপগঞ্জকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক অতীতে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড খুব বেশি নেই। তবে নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী অঞ্চলের কাছাকাছি একাধিক উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প হয়েছে।
গত বছরের ২১ নভেম্বর দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.৭ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী, যা ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পূর্বে। ভূমিকম্পে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ভবনের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। নারায়ণগঞ্জেও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।
ভূকম্পবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা অঞ্চলের ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে গত এক শতাব্দীতে একাধিক মাঝারি ও শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল-নরসিংদী অঞ্চলের ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প এবং সাম্প্রতিক দশকগুলোর একাধিক ৫ থেকে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প এই অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর বলেন, রূপগঞ্জের এই ভূমিকম্পকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শীতলক্ষ্যা নদীর আশপাশে একাধিক গোপন বা অপর্যাপ্তভাবে চিহ্নিত ফল্ট সক্রিয় রয়েছে। এ ধরনের ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প ভূগর্ভস্থ চাপ পুরোপুরি মুক্ত করে না। বরং বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনার ইঙ্গিতও বহন করতে পারে।
তিনি মনে করেন, ঢাকার চারপাশের গোপন ফল্টগুলো দ্রুত শনাক্ত করে জাতীয় ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাজধানীর জন্য পূর্ণাঙ্গ মাইক্রোজোনেশন সম্পন্ন করা জরুরি। কারণ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ নগরী হিসেবে ঢাকায় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, রূপগঞ্জের মতো ঢাকার একেবারে নিকটবর্তী এলাকায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হওয়া ভূকম্পবিদদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এতদিন দেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা প্রধানত ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট ও আরাকান সাবডাকশন জোনকে ঘিরে থাকলেও এবার ঢাকার উপকণ্ঠের স্থানীয় ফল্টগুলোর সক্রিয়তা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই ভূমিকম্পে বড় ক্ষতি না হলেও এটি রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলের ভূমিকম্প প্রস্তুতি, ভবন নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়ন এবং জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ ঢাকার খুব কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল হওয়ায় ভবিষ্যতে একই অঞ্চলে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে তার প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।
