✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো ছয় বাংলাদেশির মধ্যে পাঁচজনই নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে চারজন সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের এবং একজন পাশের বক্তাবলী ইউনিয়নের বাসিন্দা। অপর নিহত ব্যক্তি মুন্সিগঞ্জের রিকাবিবাজার এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত প্রায় ৩টার দিকে ইস্টার্ন কেপের কুইন্সটাউন এলাকায় একটি দোকানে আগুন লাগে। ওই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন-মনির হোসেনের ছেলে মো. ফাহিম (২৯), আলী মিয়র ছেলে আপন আহমেদ (২৩), নারায়নগঞ্জের আলীরটেক এলাকার মৃত শরব আলীর ছেলে নুর মোহাম্মদ, একই এলাকার ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল, ফতুল্লার মৃত আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন, মুন্সিগঞ্জের মৃত সালাম বেপারির ছেলে মো. রাজিক (৫৫)।
দক্ষিণ আফ্রিকা কেনো যে পাঠালাম। অর্থের অভাবে ছেলেকে বিদেশে কেনো পাঠালাম। আল্লাহ আমাকে নিয়ে যেতে, কেন পোলারে নিলে। এভাবে কাদঁছিলো দক্ষিণ আফ্রিকায আগুন নিহত মোহাম্মদ আপনের বাবা মুদি দোকানী আলী হোসেন। চার বছর আগে এলাকার পরিচিত রওশন মেম্বারের শপে চাকরির পাঠিয়ে ছিলেন। ভালো ভাবে চলছিল জীবন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় আগুন নিহত নুর মোহাম্মদের সঙ্গে গত রাতে কথা বলেছিল ছেলে মো. সিয়াম হোসেন। বাবা জানান দেড় মাসের পারমিট নিয়েছি, কিছু কামাই হবে। তারপর চলে আসবো। বাবা এমন কথায় বলেছিলাম দেড় মাস থাকা লাগবে না চলে আসো।
দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত ফয়সাল হোসেনের বিষয়ে ভালো খবর পাওয়ার আশায় প্রবাসী দেবরের কাছে ফোন দেন মা। ভিডিও কলে দেবরকে ফোন দিয়ে তিনি বলেন, এক ছেলে এক মেয়ে মধ্যে ছেলেটা নাকি মরে গেছে। ওরে ভাই পোলাডারে খুইজ্জা ভালো খবর দে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো জানা যায়নি। স্থানীয় পুলিশ ঘটনাটির তদন্ত করছে।
এর আগেও দেশটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একাধিক বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর নর্থ ওয়েস্ট প্রদেশের ব্রিটস শহরে একটি দোকানে আগুন লেগে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার একই পরিবারের তিনজনসহ চার বাংলাদেশি নিহত হন। এছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর কোয়াজুলু-নাটাল প্রদেশের পিটারম্যারিটজবার্গের একটি বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সে অগ্নিকাণ্ডে আরও দুই বাংলাদেশির মৃত্যু হয়।
তবে এ বিষয়ে এখনো সরকারি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রশাসনের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেননি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমান।
এদিকে হাইকমিশন জানায়, ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হাই কমিশনার শাহ আহমেদ শফী আজ দুপুরে সমো টাউন, কুইন্সটাউনের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন। সফরকালে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন, নিহত ও আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে খোঁজখবর নেবেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
এ ছাড়া, তিনি সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। বৈঠকে তিনি ঘটনার সর্বশেষ পরিস্থিতি, তদন্তের অগ্রগতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরবর্তী করণীয় বিষয়ে আলোচনা করবেন।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বললেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো বার্তা পাইনি। নানা মাধ্যমে জানতে পেরেছি, নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে, আরেকজনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। ভুক্তভোগী পরিবারের খোঁজখবর নিয়ে আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।’
সংবাদমাধ্যম থেকে খবরটি জেনেছেন নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী। ‘আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে এ বিষয়ে জানতে পেরেছি। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বার্তা আমরা পাইনি। সংশ্লিষ্ট থানায় বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে’— বললেন তিনি।
