✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৮ শতাংশে।
আইএমইডি বা বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রকাশ করা হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-মে মাসের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের এই খতিয়ান গত ১৬ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
বিগত বছরগুলোতে এই সময়ে সাধারণত গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়িত হতে দেখা গেলেও, এবার তা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
আইএমইডির ২০১০-১১ অর্থবছর পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবারই দেশের উন্নয়ন খাতের পারফরম্যান্স সবচেয়ে দুর্বল।
চলতি অর্থবছরে মোট ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দের বিপরীতে গত ১১ মাসে ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৭৬৯ কোটি টাকা।
এই খরচের খতিয়ান এবং বাস্তবায়নের হার—উভয় দিক বিবেচনাতেই দেশের উন্নয়ন খাতের এই চিত্র গত ছয় অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই নেতিবাচক পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন।
সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব তো রয়েছেই, এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তও এখানে ভূমিকা রেখেছে। নতুন সরকারের আমলে চলমান প্রকল্পগুলোর যৌক্তিকতা কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং অর্থ খরচের ক্ষেত্রে এক ধরনের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি অবলম্বন করা হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতিতে।
সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের একটি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ থাকা ২০ লাখ টাকার মধ্যে গত ১১ মাসে একটি টাকাও খরচ করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে তাদের অগ্রগতির হার শূন্য।
এছাড়া দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের ২৫ শতাংশও ব্যয় করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই তালিকায় সংসদবিষয়ক সচিবালয় ছাড়াও রয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ; জননিরাপত্তা বিভাগ; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।
উন্নয়ন খাতের এই ধীরগতির নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরেছেন।
প্রথমত, প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতা এবং ঠিকাদারদের লোকবল কমিয়ে কাজ দীর্ঘায়িত করার প্রবণতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত, জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা ও আইনি মামলার কারণে বহু প্রকল্প সময়মতো শুরুই করা যায়নি।
তৃতীয়ত, দেশের অর্থনৈতিক সংকটও এর জন্য দায়ী; চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব ঘাটতি হওয়ায় সরকারের কোষাগারে টান পড়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের মতো আবশ্যিক ব্যয় মেটানোর পর উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ছাড়ে ধীরনীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রকল্প গ্রহণের শুরুতে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করার কারণে পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন এবং ব্যয় ও সময় বাড়ার ঘটনা ঘটছে। প্রশাসনিক অনুমোদন, দরপত্র আহ্বান ও কেনাকাটার প্রতিটি স্তরে দীর্ঘসূত্রতা এবং জবাবদিহিতার অভাব সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে কিছু প্রকল্পের অগ্রাধিকার বদলে যাওয়া এবং দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে প্রকল্প সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাও উন্নয়ন কাজের গতি টেনে ধরেছে।
নতুন সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার কারণেও অনেক প্রকল্পের অর্থ ছাড় সাময়িকভাবে থমকে আছে।
