✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)।
নতুন এডিপিতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বৈষম্যহীন উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। সভায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবেরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) অধীনে একটি উপদেষ্টা কমিটি এ কাঠামো প্রণয়ন করছে। সভা শেষে ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মন্ত্রী জানান, সভায় এডিপির মোট আকার অনুমোদন করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বা জিওবি খাত থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এডিপির আকার বড় হওয়ায় সরকারের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের ইঙ্গিত মিলছে।
নতুন অর্থবছরের এডিপিতে ১ হাজার ২৭৭টি নতুন প্রকল্পের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় ৮০টি এবং বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ ও জলবায়ু অভিযোজনকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় আরও গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এডিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। চলমান অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন হার বেড়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। এ কারণে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব এমন প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্পে নতুন ব্যয় সীমিত রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দে স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ব্যয় করা হবে।
সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর আলোকে এডিপিকে পাঁচটি প্রধান স্তম্ভে বিন্যস্ত করা হয়েছে।
প্রথম স্তম্ভ ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার’: এতে বিচার ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাল্টি-ইয়ার পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এমওয়াইপিআইপি) চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
দ্বিতীয় স্তম্ভ ‘বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন’: এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাতগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে।
তৃতীয় স্তম্ভ ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’: এতে জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবহন অবকাঠামো, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ স্তম্ভ ‘অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন’: এতে উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল এবং বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলাকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার পাশাপাশি উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণেও জোর দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চম স্তম্ভ ‘ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি’: এততে সামাজিক সম্প্রীতি, সংস্কৃতি বিকাশ, যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে নতুন এডিপিকে একটি সংস্কারমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকার মনে করছে, প্রশাসনিক দক্ষতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন যাত্রায় এ পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
