✍︎ কলকাতা প্রতিনিধি ✍︎
অবৈধভাবে বসবাসকারী ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের জন্য হোল্ডিং সেন্টার চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
প্রথম দিনেই ১২ জন বাংলাদেশিকে হোল্ডিং সেন্টারে আটক করে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন। আর এরপরেই বাংলাদেশে ফিরে যেতে ভারতীয় সীমান্তে মানুষের ঢল নেমেছে।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর সেসময় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে লম্বা লাইন দেখা গিয়েছিল। কাঁটাতার পার করে যারা অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাদের দেশে ফেরার হিড়িক চোখে পড়েছিল মাস কয়েক আগে। এবার রাজ্য সরকারের নতুন ঘোষণার পর ফের একই ছবি দেখা গেল। এসআইএর প্রক্রিয়ার পরেও যারা অবৈধভাবে ভারতে থেকে গিয়েছিল মূলত তারাই আবারও বাংলাদেশে ফিরে যেতে ভিড় জমাচ্ছেন সীমান্তে।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সকাল থেকে উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের হাকিমপুর থানার বিঠারি হাকিমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনস্থ হাকিমপুর চেকপয়েন্টে দেখা গেল লম্বা লাইন। পশ্চিমবঙ্গের দাবি, ভিড় জমাচ্ছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। অবৈধভাবে যারা ভারতে বসবাস করতেন, যারা দালালদের ধরে এ দেশে প্রবেশ করেছিলেন, তারাই এবার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছেন।
সীমান্তে একদিনেই ভিড় করেছেন নারী শিশু সহ অন্তত ৬০০ জন মানুষ। যারা এতদিন ভারতে এসে আত্মগোপন করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন, তারা আবার বাংলাদেশে ফেরার জন্য স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্তে উপস্থিত হয়েছেন।
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান যে, অবৈধ বাংলাদেশি বাসিন্দাদের শনাক্ত করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে, এরপর বিএসএফ তাদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করবে। এই ধরনের পদক্ষেপ শুরু হওয়ার আগেই শত শত বাংলাদেশি সীমান্তে ভিড় জমাচ্ছেন।
কোনরকম দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে না গিয়ে তারা স্বীকার করছে যে তারা ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করতেন। এক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সরকার আর রাখবে না, কী করব বলুন।’ কেউ বলছেন, এ দেশে এসে দোকানে কাজ করতেন, কেউ পরিচারিকার কাজ করতেন।
প্রসঙ্গত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোট প্রচারে পশ্চিমবঙ্গে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট করার ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ক্ষমতায় আসার ২০ দিনের মধ্যেই মাসের মধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শুরু করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার।
শুভেন্দুর আরও ঘোষণা, আইনি প্রক্রিয়া নয়। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়লে সরাসরি বিএসএফের কাছে তুলে দেওয়া হবে তাকে, এরপর হবে পুশব্যাক। যার জন্য কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা মেনে রাতারাতি চালু করা হয়েছে হোল্ডিং সেন্টার। এমন অবস্থায় আতঙ্ক বেড়েছে অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তে ভিড় বাড়ছে অনুপ্রবেশকারীদের।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) হাওড়ার নতুন কালেকটারেটে দাঁড়িয়ে আরপিএফ (রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এই নির্দেশ দেন তিনি। পেট্রাপোল-বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে সরাসরি ফেরত পাঠানোর কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন, সীমান্ত-নীতিতে তার সরকার কতটা কঠোর হতে চলেছে।
বৈঠকে বারবার উঠে এসেছে অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা, হাওড়া স্টেশনকে ঘিরে অবৈধভাবে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের চিহ্নিত করতে হবে। আইনি মারপ্যাঁচে সময় নষ্ট না করে দ্রুত বিতাড়নের নির্দেশ দেন তিনি। প্রশাসনের একাংশের মতে, ভোটের আগে সীমান্ত ও পরিচয়ের রাজনীতিকে সামনে আনতে চাইছে ক্ষমতাসীন দল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হাওড়া-বালি পুরভোটকে বাজপাখির চোখ করেছে বিজেপি। একদিকে সীমানা নির্ধারণ ও দ্রুত ভোটের ঘোষণা দিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতার বার্তা, অন্যদিকে অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে কড়া অবস্থান। দুইয়ে মিলে ভোটের ময়দান গরম করার কৌশল স্পষ্ট।
শপথের পর থেকেই জেলায় জেলায় প্রশাসনিক বৈঠক করে ‘কাজের সরকার’ ছাপ ফেলতে চাইছেন শুভেন্দু। হাওড়ার মতো ঘিঞ্জি শিল্পাঞ্চলে ভোট, রেলের সঙ্গে সমন্বয় আর সীমান্ত-নীতিকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, রাজনীতি আর প্রশাসনকে আলাদা রাখতে রাজি নন।
প্রশাসনিক বৈঠকের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত রাজ্য পুলিশের ডিজি, পুরো নগর উন্নয়ন দপ্তরের কর্মকর্তারা, হাওড়া শহরে জেলা প্রশাসক, পুলিশ কর্মকর্তারা, পৌর কর্মকর্তাসহ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার। হাওড়া শহর ও স্টেশন চত্বরের জল-নিকাশি, যানজট, বেআইনি দখল সব সমস্যায় রেল-রাজ্য যৌথভাবে নামবে। আগের শাসনে রেল-পৌরসভার ঠান্ডা লড়াইয়ে ভুগেছে শহর। সেই ছবি বদলাতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিন সকালে প্রথমে তিনি উপস্থিত হন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রধান কার্যালয় বেলুড় মঠে। সেখানে পিছুটা সময় কাটানোর পরে দুপুর ১২টা নাগাদ প্রশাসনিক বৈঠক করতে উপস্থিত হন হাওড়া জেলাশাসকের দপ্তরে, এরপরে তিনি সেখান থেকে রওনা দেন দুর্গাপুরের উদ্দেশে সেখানে তার একটি প্রশাসনিক ও একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে। সেই কর্মসূচি সম্পূর্ণ করে সন্ধ্যায় তিনি দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেবেন তিনি। সেখানে জাতীয় অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
