পুলিশ হেফাজতে রায়হান হত্যা: এসআই আকবরের মৃত্যুদণ্ড

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

সিলেটে ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর পুলিশ হেফাজতে রায়হান উদ্দিন আহমদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি পুলিশ থেকে সাময়িক বরখাস্তকৃত উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

একই মামলায় অভিযুক্ত কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাসের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুনসী আব্দুল মজিদ এ রায় দেন।

রায়ে অপর তিন আসামিকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন-এসআই হাসান উদ্দিন, পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহি ও এসআই আকবরের আত্মীয় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমান। রায়ের সময় হাজতে থাকা একমাত্র আসামি আশেক এলাহি শুধু আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন বলেন,  মামলায় ৬৯ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬১ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট।

আদালত সূত্রে জানা যায়, দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে আকবর হোসেন, হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাসকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া সাত বছর কারাদণ্ড পাওয়া আসামিদের ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

২০২০ সালের ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। পরের দিন তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রীর করা মামলার পর অভিযোগের সত্যতা পায় সিলেট মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি। পরে ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেনসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়।

এরপর পুলিশি হেফাজত থেকে কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২১ সালের ৫ মে আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পিবিআই। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন গ্রেফতার হওয়ার পর জেলহাজতে ছিলেন। তবে প্রথম থেকেই পলাতক ছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান।

সর্বশেষ গত বছরের আগস্টে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান আকবর হোসেন। এরপর ১১ আগস্ট সিলেট কারাগার থেকে ছাড়া পান তিনি।  ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ পিটিশন ফর লিভ টু আপিল দায়ের করে। শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ উচ্চ আদালতের আদেশ স্থগিত করেন। পাশাপাশি আকবর হোসেনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন; কিন্তু আদালতে আর আত্মসমর্পণ করেননি আকবর।

রায়হান আহমদ হত্যা মামলার রায়ে আদালত মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, আটক অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার অধিকার পুলিশ কিংবা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই। কোনো ব্যক্তি দুর্ধর্ষ অপরাধী হলেও বিচার ছাড়া তাঁকে শাস্তি দেওয়ার অধিকারও কারও নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হয়।

আটক ব্যক্তির শরীর ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিশেষ দায়িত্ব আটককারী কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায় উল্লেখ করে আদালত বলেন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়, তথ্য সংগ্রহ কিংবা কথিত অপরাধের শাস্তি দেওয়া আইনের শাসনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা শুধু ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের প্রতি ন্যায়বিচার নয়; ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখারও পূর্বশর্ত।

মরদেহে ছিল ১১১টি আঘাতের চিহ্ন

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর গভীর রাতে সিলেট নগরীর আখালিয়ার এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে (৩৪) বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে এনে নির্যাতন করেন ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়াসহ পুলিশ সদস্যরা। পরদিন সকালে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে নিহত রায়হানের মরদেহে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৯৭টি ফোলা আঘাত ও ১৪টি গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পান চিকিৎসকরা।

এই ঘটনায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। পরে সিলেট মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি তদন্ত করে ফাঁড়িতে নিয়ে রায়হানকে নির্যাতনের সত্যতা পায়।

‘আমার রায়হানকে যারা নির্যাতন করে মারছে তারা তো পালিয়ে গেছে’

এদিকে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার আগে আদালত প্রাঙ্গনে আসেন নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদের মা সালমা বেগম।

এ সময় আসামিরা জামিন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘ ৬ বছর পর রায় ঘোষিত হবে। কিন্তু এই রায় শুনে আমি কি করব। আমার রায়হানকে যারা নির্যাতন করে মারছে তারা তো পালিয়ে গেছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ সরকার থাকতে একজনের জামিন হয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে মামলার আর্গুমেন্ট শেষ হওয়ার পরও কিভাবে প্রথম তিনজন আসামিই জামিন পায়..? জামিন পেয়ে কিভাব তারা পালিয়ে যায়..?”

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আজকে তো শুধু কাগজে কলমে রায় হবে, আসামিরা তো শাস্তি পাচ্ছে না। আসামিরা শাস্তি না পেলে তো আমার ৬ বছরের অপেক্ষা আর কষ্ট বিফলে গেল।”

পিপি মুমিনুল ইসলাম মোমিন বলেন, “আলোচিত এই হত্যা মামলার ৬ আসামির মধ্যে কেবল পুলিশের বহিস্কৃত এএসআই আশেক-ই-এলাহী কারাগারে আছেন। বাকিরা আসামিরা পলাতক। রায় ঘোষণার আগে কারাগারে থাকা মামলা একমাত্র আসামি এলাহীকে আদালতে আনা হয়।”

মামলার রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট। তবে আরও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে।”

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *