✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সৌদি আরব ও তুরস্ক ইতিবাচক এবং এই জোটে যুক্ত হওয়া নিয়ে ঢাকা কোনো ঝুঁকি দেখছে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির। এই জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, বাঁচার আগে মরার চিন্তা করলে সমস্যা।
রোববার (৩০ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির এসব কথা বলেন।
রোববার ঢাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকালে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে চুক্তিভুক্ত সদস্যদেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর। তারা বাংলাদেশকে এ চুক্তিতে নেওয়ার বিষয়ে অভিপ্রায় প্রকাশ করলে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই এটাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মক্কা চুক্তি বিশ্বের মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা। তিনি আরও বলেন, মক্কা চুক্তি তিনটি দেশের ভেতরে হয়েছে। আমরা এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এতে যোগদান বা যোগদান না করার বিষয়টি এখনো আসেনি। কারণ এটা নির্ভর করছে যারা এর সদস্য তাদের অভিপ্রায়ের ওপর।
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি গত ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালিত হলে তা বাকি সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
মন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, মক্কা চুক্তির তিন দেশ যদি অভিপ্রায় প্রকাশ করে বাংলাদেশকে এতে যুক্ত করতে তাহলে পরে আমরা নিশ্চয়ই সেটা ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করব। আমরা নিশ্চয়ই এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখব। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে একটা কথা যে এই চুক্তি যদি বিস্তৃত হয় এবং এটা হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা। এটা আমাদের মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং এটা নিয়ে অন্যান্যদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই।
এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন রোববার (৩০ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
বৈঠকে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের কৌশলগত। তারই অংশ হিসেবে কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ শুরু করতে যাচ্ছে দুই দেশ। তবে দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমান অস্থির ও সংকটময় বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে কোনো বিশেষ একটি সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিকল্পগুলোকে সীমিত করে ফেলবে কিংবা অন্য জোট ও সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে বাধা দেবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের এই সংকটপ্রবণ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুনির্দিষ্ট কোনো একটি অঞ্চলে বা ক্ষেত্রে যুক্ত থাকার মানে অন্য কোনো জোট বা ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার সুযোগ হারিয়ে যাওয়া নয়। এটি আমাদের কাজের পরিধিকে মোটেই সংকুচিত করে না।’
আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির কথা পুনরুল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেখানেই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখার সুযোগ থাকবে, বাংলাদেশ সেখানেই যুক্ত থাকবে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে। তাই, যেখানেই শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রধান লক্ষ্য হবে, বাংলাদেশ সব সময় সেখানেই ভূমিকা রাখবে।
সম্প্রতি ওআইসির ২৩তম বিশেষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের (সিএফএম) বৈঠকে যোগ দিতে জেদ্দা সফরে যান প্রতিমন্ত্রী। সফরকালে তিনি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
জেদ্দায় এসব বৈঠকে প্রস্তাবিত মক্কা চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না—জানতে চাওয়া হলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সেখানকার নেতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’।
তবে প্রতিমন্ত্রী এটিও জানান, এই জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায়নি। তিনি বলেন, ‘যখন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আমন্ত্রণপত্র আসবে, তখন আমরা অবশ্যই আপনাদের বিষয়টি জানাব।’
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বস্থানীয় অবদান ও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত নিরাপত্তা অভিযানের অভিজ্ঞতার কারণেই এই চুক্তির প্রতি ঢাকার মনোভাব ইতিবাচক বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের কাঠামোর অধীনে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান দেশ। শান্তি রক্ষা করা আমাদের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। এই ক্ষেত্রে আমাদের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।’
বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষা অভিযান পরিচালনা করতে পারি, তবে এখানে আমাদের মুসলিম ভ্রাতৃত্বের স্বার্থে ভূমিকা রাখতে পিছপা হব কেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই ময়দানে নতুন নই, শান্তিরক্ষা অভিযানে আমরা কোনো নবীন খেলোয়াড় নই। আমরা এই কাজের বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সবচেয়ে বেশি সেনা প্রেরণকারী দেশগুলোর একটি।’
সৌদি আরব যেহেতু দুটি পবিত্র মসজিদের হেফাজতকারী, তাই মুসলিম বিশ্বের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এমন একটি উদ্যোগে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে সাড়া দেওয়াকে ‘একদমই খারাপ কিছু নয়’ বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।
এই চুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি-সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আলোচনা অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে এবং ভবিষ্যতে সম্পর্কের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কেমন রূপ নেয়, তা সময়ই বলবে।
জেদ্দা সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকটি ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া ওআইসি বৈঠকের ফাঁকে তিনি কাতার, কুয়েত ও মালদ্বীপের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও একাধিক বৈঠক করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের ‘সুনামের চিহ্ন’ এখন সবচেয়ে জোরালো অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ এই সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
