✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে মারা গেছে চার দিন বয়সী দুই নবজাতক। সন্তান হারানোর পর বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মা নাজমা বেগম। আর বাবা হাসান সরদারের কণ্ঠে শুধু একটাই কথা, ‘আজকেই তো বাবুদের বাসায় নিয়ে আসার কথা ছিল… এখন কবর দিয়ে ফিরছি।’
রাজধানীর নন্দীপাড়া এলাকায় বসবাসকারী এই দম্পতির গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দাসপাড়া গ্রামে। হাসান সরদার ছোট ব্যবসায়ী। এর আগে তাঁদের দুটি ছেলেসন্তান রয়েছে। এবার পরিবারে জন্ম নেয় যমজ দুই ছেলে।
হাসান সরদার জানান, গত শনিবার মাগরিবের পর তাঁর স্ত্রীকে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোববার সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম হয় যমজ সন্তান দুটির। তিনি বলেন, ‘অপারেশনের পর মা সুস্থ ছিল। বাচ্চারাও প্রথমে ভালো ছিল। তিন দিন ধরেই ডাক্তার-নার্স বলছিল সব ঠিক আছে। কাল রাতেও কোনো সমস্যা ছিল না।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, শিশু দুটির নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাখা হয়নি। পরিবারে নাম নিয়ে আলোচনা চলছিল। বড় দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিল রেখে নতুন সন্তানদের নাম রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেই নাম আর রাখা হলো না!
শিশু দুটির বাবা অভিযোগ করেন, গতকাল মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ ওয়ার্ডের ভেতরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে শিশুদের বমি শুরু হয়। পরে তাঁরা জানতে পারেন, রুমের ভেতরে গ্যাসের মতো কিছু ছড়িয়ে পড়েছিল।
হাসান সরদার বলেন, ‘বাচ্চাগুলো বমি করতেছিল। আরও কয়েকটা বাচ্চা ওই রুমে ছিল। পরে শুনলাম, গ্যাসের মতো কিছু ছিল ভেতরে।’
হাসান আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘শিশুদের অবস্থার অবনতি হলেও শুরুতে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একজন বলতেছে পাঁচতলায় নেন, আরেকজন বলতেছে চারতলায় নেন। অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে এভাবে দৌড়াদৌড়ি করতেছি। একপর্যায়ে যমজ শিশুকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিবারের হাতে মৃত্যুসনদ তুলে দেয়।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাসান সরদার বলেন, ‘চার দিন ধরে আমার বাচ্চাগুলা ভর্তি ছিল। ডাক্তাররা যে পরীক্ষা করতে বলছে, সব করছি। ১০ হাজার টাকার ওষুধও কিনছি। আমি তো না করি নাই। তারপরও আমার বাচ্চাগুলারে বাঁচাইতে পারল না!’
বুধবার দুপুরে স্থানীয় মসজিদের কবরস্থানে দুই শিশুকে দাফন করা হয়েছে। সন্তানদের দাফন শেষে ফিরে এসে হাসান সরদার বলেন, ‘আজকেই তো বাসায় নিয়ে আসার কথা ছিল, এখন কবর দিয়ে ফিরছি।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তান হারানোর পর মা নাজমা বেগম এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি। হাসপাতালের বেডে শুয়ে তিনি শুধু নিঃশব্দে কাঁদছেন। প্রায় কথাই বলতে পারছেন না।
এদিকে ঘটনার পর হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডে তদন্তে যায় সিআইডির বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। সংশ্লিষ্ট সদস্যরা জানিয়েছেন, ওয়ার্ডে এখনো গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ওই রাতে ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা তিন নার্স লিজা, রেখা ও তারিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খোঁজা হচ্ছে। বিকেল পর্যন্ত একজন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ডাকে সাড়া দিলেও অন্য দুজন এখনো হাসপাতালে আসেননি।
‘আমার নাতনির বয়স মাত্র তিন দিন, এভাবে চলে যাবে ভাবতেই পারিনি’
‘আমার নাতনির বয়স মাত্র তিন দিন, এভাবে চলে যাবে ভাবতেই পারিনি’- কথাগুলো বলতে গিয়ে কেঁদে উঠছিলেন মাসুদা বেগম। এ সময় কোলে জড়ানো ছিল তার নাতনির নিথর দেহ। পরিবারের প্রথম সন্তানকে ঘিরে যে স্বপ্ন, তা থেমে গেছে জন্মের মাত্র তিন দিনের মাথায়।
রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একই ওয়ার্ডে থাকা ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় এমনই শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
বুধবার হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে নেমে এসেছে ভারী নীরবতা। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্নায় পরিবেশ হয়ে ওঠে ভারাক্রান্ত।
শিশুটির মা মিম আক্তার হাসপাতালের বেডে শুয়ে বারবার চোখ মুছছিলেন। দাদি মাসুদা বেগম জানান, ছেলে আরিফ ও পুত্রবধূ মিম আক্তার কাজের কারণে ঢাকায় থাকেন। তাদের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলায়। সন্তান জন্মের খবর পেয়ে পরিবারের সবাই আনন্দিত ছিলেন। কিন্তু বুধবার সকালে সেই আনন্দ মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়। এটি ছিল তাদের প্রথম সন্তান। এখনো নামও রাখা হয়নি শিশুটির।
তিনি বলেন, ‘সকালে আমার ছেলে ফোন করে বলেছিল বাচ্চার অবস্থা খারাপ। পরে জানতে পারি সে আর বেঁচে নেই। হাসপাতাল থেকে আমাদের কিছুই স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি।’
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ওই ওয়ার্ডে ১১ জন মা ও ছয় নবজাতক ছিলেন। শিশুদের বয়স ছিল এক থেকে তিন দিনের মধ্যে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের মহাপরিচালক (হসপিটালস অ্যান্ড নার্সিং) অধ্যাপক ডা. নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘বিষয়টি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এসির গ্যাস লিকেজ থেকে বিষক্রিয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।’
ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশ। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। একই সঙ্গে অন্য রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, আদ-দ্বীন হাসপাতাল অলাভজনক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন’-এর মালিকানাধীন। এই ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সেখ মহিউদ্দিন। তিনি আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সেখ আকিজ উদ্দিনের বড় ছেলে।
