আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ৬ শিশুর মৃত্যু

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে এসির গ্যাস লিকেজ থেকে এক ওয়ার্ডে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (২৭ মে) সকালে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) তারিকুল ইসলাম মুকুল মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, হাসপাতালের ওয়ার্ডে এসির হঠাৎ ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর সেখান থেকে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুদের অবস্থার তাৎক্ষণিক অবনতি ঘটলে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়।

বুধবার (২৭ মে) সকালে হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ রুমের সামনে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক স্বজনের আহাজারি। কারও কোলে সদ্যোজাত শিশুর নিথর দেহ, পাশে বসে আছেন সদ্য সিজারিয়ান অপারেশন হওয়া মা—যিনি নিজেই ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না, অথচ সন্তানের মৃত্যু মেনে নেওয়ার যুদ্ধ করছেন।

যে সময়ে নবজাতকদের মায়ের বুকের উষ্ণতায় থাকার কথা, সেই নবজাতকদের মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো। অনেক মা এখনো অপারেশনের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণের আগেই তারা সন্তানের মরদেহের পাশে বসে আছেন।

স্বজনদের অভিযোগ, মঙ্গলবার রাত থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে নবজাতকদের দেখতে দিচ্ছিল না। রাত থেকে পোস্ট অপারেটিভ রুমে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছিল বলেও অভিযোগ করেন তারা।

কেরানীগঞ্জের নাদিমের ভাতিজাও মারা গেছে এই ঘটনায়। তিনি বলেন, গতকাল রাত থেকেই কাউকে ভেতরে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না। নার্সরা রাতে বলেছিল, এসিতে সমস্যা। সকালে দেখি একে একে শিশুদের বের করে আনা হচ্ছে। কেউ বমি করছে, কারও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সকালেই আমার ভাইয়ের ছেলে মারা যায়।

পোস্ট অপারেটিভ রুমের সামনে বসে ছিলেন শারমিন আক্তার। তার কোলে ভাইয়ের এক দিন বয়সী ছেলের নিথর দেহ। পাশে বসা শিশুটির মা—গতকালই তার সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে। নিজের সন্তানের মরদেহ কোলে নেওয়ার শক্তিও নেই তার।

শারমিন বলেন, আমার ভাইয়ের ছেলে গতকালও সুস্থ ছিল। কোনো সমস্যা ছিল না। আমার মা পোস্ট অপারেটিভ রুমে ঢুকেছিলেন। এসি বন্ধ থাকায় ভেতরে দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা ছিল। তিনি অসুস্থ হয়ে দ্রুত বের হয়ে আসেন। আমরা কর্তৃপক্ষকে বললেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। সকালে দেখি আমার ভাইয়ের ছেলে বমি করছে। কিছুক্ষণ পর মারা যায়।

আরও কয়েকজন স্বজন অভিযোগ করেন, পোস্ট অপারেটিভ ফ্লোরে কোনো পুরুষ স্বজনকে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না। ভেতরে যেসব স্বজন প্রবেশ করেছিলেন, তাদের দাবি—সেখানে বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না।

আবু বক্কর নামে এক স্বজন বলেন, আমার বোনের মেয়ে আইসিইউতে ভর্তি। আজ সকালে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। যেখানে শিশুদের রাখা হয়েছিল, সেই পরিবেশ খুব খারাপ। রাত থেকে কাউকে শিশুদের দেখতে দেওয়া হয়নি। তাদের ব্যবস্থাপনা খুবই খারাপ। আমরা দেখেছি, অনেক শিশুকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সরানো হয়েছে। এত বড় ঘটনা হলেও স্বজনদের কিছু জানানো হয়নি।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ঘটনাটি ঘটেছে তাদের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে।

রুমে কোনো ভেন্টিলেশন ছিল না, দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের

রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালে এসির গ্যাস লিকেজের ঘটনায় এক ওয়ার্ডে ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।

বুধবার (২৭ মে) সকালে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) তারিকুল ইসলাম মুকুল এশিয়া পোস্টকে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ ঘটনায় আদ-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিনের দাবি, ওই রুমে কোনো ভেন্টিলেশন ছিল না, তাই হয়তো এসি বন্ধ রাখায় শ্বাসকষ্ট বা সাফোকেশনের কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে।

বুধবার (২৭ মে) দুপুরে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে সিজারের পর মা ও নবজাতকদের রাখা হয়। বাচ্চারা সুস্থ ছিল। রাতে কোনো এক বাচ্চার মা এসি বন্ধ রাখতে বলেছিল। অনেক সময় গরম বা ঠান্ডা লাগার কারণে চাহিদামতো এসি বন্ধ বা চালু রাখা হয়।

ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, মঙ্গলবার রাত ৩টার দিকে দুটি বাচ্চা হঠাৎ একটু অসুস্থ হওয়ায় তাদেরকে নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকরা তাদের অবস্থা ভালো দেখে পরে আবার ওয়ার্ডে ফেরত পাঠিয়ে দেন।

তিনি বলেন, পরে ভোর ৬টার দিকে দায়িত্বরত নার্স দেখেন যে ওয়ার্ডের বাচ্চাদেরকে অসুস্থ মনে হচ্ছে। এ সময় বাচ্চাদের মায়েরা একই কথা বলেন। পরে দ্রুত তাদেরকে এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। এ সময় দায়িত্বরত চিকিৎসকরা দুটি নবজাতককে ব্রট ডেড (আগেই মৃত) অবস্থায় পায়। বাকী চার নবজাতকও ক্রিটিক্যাল অবস্থায় ছিল। তাদেরকে দ্রুত ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়। কিন্তু তাদেরকে আর বাঁচানো যায়নি।

একত্রে ছয় শিশুর মৃত্যুর কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই ঘটনা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর। পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড তিন ভাগে করা। ওই অংশে এই ছয় নবজাতক ছিল। অন্য কোনো ওয়ার্ডে এ ধরনের কিছু ঘটেনি। যেহেতু ওই রুমে কোনো ভেন্টিলেশন ছিল না, তাই হয়তো এসি বন্ধ রাখায় শ্বাসকষ্ট বা সাফোকেশনের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, ছয় নবজাতক শিশুসহ ১১ জন মা পোস্ট অপারেটিভ রুমে ছিলেন। ঠান্ডা অনুভূত হওয়ায় এসি বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেন এক নবজাতকের মা।

তিনি বলেন পরে নার্স এসি এক ঘণ্টার মতো বন্ধ রাখেন। এরপর গরম অনুভূত হওয়ায় এসি চালু করতে বললে দুই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পর বাকি চার শিশুও অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় শিশুর মৃত্যু হয়। এখানে সিআইডির ক্রাইম টিম কাজ করছে। আলামত সংগ্রহ করছে।

সন্তান হারানো আরেক মা জানান, রাতে ওয়ার্ডের প্রায় সব শিশুই কান্না ও বমি করছিল। তারা কেউ বুঝতে পারেননি কী ঘটছে। সকালে শিশুর অবস্থা খারাপ হলে তাকে এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা প্রথমে আশ্বস্ত করলেও কিছু সময়ের মধ্যেই শিশুটির মৃত্যুর খবর পান তারা।

আদ-দ্বীন হাসপাতালে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনাটি জানতে পেরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জাহিদ রায়হান আদ-দ্বীন হাসপাতালে যাচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাতে হাসপাতালের একটি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুদের মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে এসি বা গ্যাস লিকেজের বিষয়টি আলোচনায় এলেও এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্ত শেষে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।

৬ নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন

আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ৩ সদস্যদের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। আগামী তিন দিনের মধ্যে এই তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেবে। 

বুধবার (২৮ মে) আদ-দ্বীন হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এ তথ্য জানান। 

তদন্ত কমিটিকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড ও এনআইসিইউ’র কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি কারিগরি ত্রুটির কারণেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

এরইমধ্যে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল কারিগরি ত্রুটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কাজ শুরু করেছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *