ইনুর ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তাকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তিনটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় হাসানুল হক ইনু কাঠগড়ায় ছিলেন। রায়টি বিটিভির মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিন নম্বর অভিযোগে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে এক লাখ টাকা করে মোট ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং প্রতিটি অভিযোগে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ফলে তিনটি অভিযোগে মোট ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলেও সাজাগুলো একসঙ্গে (একযোগে) কার্যকর হবে। সে কারণে ইনুকে কার্যত ১০ বছরের কারাদণ্ডই ভোগ করতে হবে। এছাড়া ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘এটি একটি ফরমায়েশি রায়। প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে আমাকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেলাম।’

এর আগে গত ২২ জুন রায়ের জন্য এ দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। তার আগে ১৪ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করা হয়। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মামলার তদন্ত শুরু হয় এবং ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়।

পরে গত বছরের ২ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ইনুর বিরুদ্ধে আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-নিজের নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় সম্পৃক্ততা, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় উসকানি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে থেকে আন্দোলন দমনে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ।

মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে ১০ জন এবং আসামিপক্ষে দুইজন সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে ১৩ মে শেষ হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় নিহত ছয়জন হলেন-শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।

আট অভিযোগ

প্রথম অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেন ইনু। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা দেন এবং হত্যারও নির্দেশ দেন তিনি।

দ্বিতীয় অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪–দলীয় জোটের সভা হয়। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’–এর সিদ্ধান্ত হয়। হাসানুল হক সেই সভায় উপস্থিত থেকে ‘শুট অ্যাট সাইট’–এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা করেন।

তৃতীয় অভিযোগ, ছবি দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র–জনতার তালিকা প্রণয়ন এবং তাঁদের আটক ও নির্যাতন করার জন্য কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ।

চতুর্থ অভিযোগ, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্রের ব্যবহার করা এবং ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বম্বিংয়ের পরিকল্পনা করার অভিযোগ।

পঞ্চম অভিযোগ, গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া। সরকারের গ্রহণ করা হত্যাকাণ্ড সংঘটনসহ নির্যাতন–নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করা।

ষষ্ঠ অভিযোগ, ১৪–দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

সপ্তম অভিযোগ, শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকা।

অষ্টম অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন নামের ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যায় নির্দেশনা প্রদান। পাশাপাশি সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র–জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ।

ইনুর বিরুদ্ধে রায়কে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ দাবি করে জাসদের বিক্ষোভ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে দেওয়া রায়কে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিহিংসামূলক’ আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)।

জাসদ ঢাকা মহানগর কমিটির উদ্যোগে মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। মিছিলটি রাজধানীর শিক্ষা ভবনের সামনে থেকে শুরু হয়ে প্রেসক্লাব, তোপখানা রোড, পল্টন ও জিরো পয়েন্ট এলাকা প্রদক্ষিণ করে। পরে জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হন নেতা-কর্মীরা।

মহানগর জাসদের সমন্বয়ক মীর হোসাইন আখতারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শফি উদ্দিন মোল্লা, স্থায়ী কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুজ্জামান বাদশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন খান জকি, শওকত রায়হান, নইমুল আহসান জুয়েল, ওবায়দুর রহমান চুন্নু এবং মীর্জা মোঃ আনোয়ারুল হকসহ আরও অনেকেই। 

সমাবেশে বক্তারা হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ঘোষিত রায় প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এই রায় নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছুই নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আদালতকে উল্টে দেয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত সেই আদালতে বীরমুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনুর বিচার করাটাই একটি প্রহসন। 

তাদের দাবি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে হাসানুল হক ইনুর অগ্রণী ও বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্যই তার উপর এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হচ্ছে। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *