লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার সাবেক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আদালতে হাজিরের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেন।

রাজধানীর শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার মামলায় ‘নিজের ফাঁসি’ দাবি করেছেন সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। বৃহস্পতিবার দুপুরে মামলাটির শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনালের এজলাসের কাঠগড়া থেকে হাজতখানায় নেওয়া হচ্ছিল তাকে। এ সময় লতিফ সিদ্দিকী বলছিলেন, ‘বলতে চাচ্ছিলাম যে আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন।’

এদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর কাছে কথা বলার অনুমতি চেয়ে পাননি লতিফ সিদ্দিকী। তাকে গণহত্যার অভিযোগে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল লতিফ সিদ্দিকীকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখান।

শুনানির সময় লতিফ সিদ্দিকী আদালতে বক্তব্য দিতে চান বলে আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী। ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন গ্রহণ করেননি। এ সময় কাঠগড়ায় থাকা মাইক্রোফোনে লতিফ সিদ্দিকী বললেন, ‘মহামান্য আদালত, আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’ তিনি কয়েকবার একই কথা বললে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘কে কথা বলছে? তাকে কথা বলার জন্য কে অ্যালাউ করেছে? আজকের মতো এখানেই স্টপ।’

এ সময় লতিফ সিদ্দিকী মন্তব্য করেন, ‘হায়রে হায় হায়। এই যদি হয় আদালত, আমি কোথায় যাই?’ এরপর পুলিশ সদস্যরা তার কাছ থেকে মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে লতিফ সিদ্দিকীর উচ্চবাচ্য হয়।

পরে কাঠগড়া থেকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নেওয়ার সময় একজন সাংবাদিক লতিফ সিদ্দিকীর কাছে জানতে চান, ট্রাইব্যুনালে তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন? এ সময় লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘বলতে চাচ্ছিলাম যে আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন।’

শুনানির সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন তার ছোট ভাই ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। শাপলা চত্বরের ঘটনায় লতিফ সিদ্দিকী একেবারে নির্দোষ বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘এটা একেবারে অন্যায়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

এর আগে ২৯ জুলাই তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এর আগে বুধবার সকালে ঢাকার শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আদালতে হাজিরা দেন সাবেক এই মন্ত্রী। পরে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তিনি জানান, মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি ১০ নম্বর আসামি হিসেবে রয়েছেন। এ মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার না করলে আগামী সপ্তাহে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে আত্মসমর্পণ করার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

হাজিরা শেষে আদালত থেকে বের হয়ে লতিফ সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় অভিযুক্ত, এ জন্য আজ আদালতে এসেছি। যে মামলায় আমি ২০২৫ সালে গ্রেফতার হয়েছিলাম। আজকে কিন্তু আমি একটা বিশেষ প্রয়োজনে এসেছি। আপনারা (সাংবাদিকেরা) জানেন কি না জানি না, আমাকে আজকে সকাল বেলা জানানো হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা হয়েছে, শাপলা চত্বরে হেফাজত ইসলামের সমাবেশের ওই মামলা। সেই মামলায় আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, আমি জানি, আজকে যদি আমি আদালতে না আসি, তাহলে মনে করা হবে আমি বোধহয় আত্মগোপনে চলে গেছি। আমি সাধারণত আত্মগোপন করি না; সব সময় আত্মপ্রকাশ করতে চাই। সেজন্যই আজকে এসেছি। এখন পুলিশ যদি আমাকে গ্রেফতার না করে, তাহলে আগামী রোববার বা সোমবার আদালতে গিয়ে নিজেকে সমর্পণ করবো। গ্রেফতাররি পরোয়ানা জারি করেছে, আমাকে যেতে হবে না? এর মধ্যে যদি পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, তাহলে তো ভিন্ন কথা। আমি কিন্তু এবার আর ২৮ তারিখের মতো অপ্রস্তুত নই, প্রস্তুত হয়েই এসেছি। আমার গাড়িতে ব্যাগ আছে, লেখালেখির জন্য খাতা-কলম আছে।

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

গত সোমবার দুপুরে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।

এ মামলায় মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন- শেখ হাসিনা, ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শামসুল হক টুকু, হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আব্দুর রাজ্জাক, মাহবুবউল আলম হানিফ, হাসান মাহমুদ চৌধুরী, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, মৃনাল কান্তি দাশ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডা. দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ওমর ফারুক চৌধুরী, সালাউদ্দিন মাহমুদ ও ডা. ইমরান এইচ সরকার, শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা, হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজীর আহমেদ, মোখলেসুর রহমান, জেনারেল আজিজ আহমেদ, জিয়াউল আহসান, মজিবুর রহমান, আব্দুল জলিল মন্ডল, শেখ মো. মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন, মনিরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, মুহা. আশরাফুজ্জামান, এস এম মেহেদী হাসান, হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, এস এম শিবলী নোমান ও বি এম ফরমান আলী।

এ মামলায় বর্তমানে ৯ আসামি গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহিদুল হক, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক ফারজানা রুপা এবং মোজাম্মেল বাবু।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *