রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যে সংবিধানে সংশোধন

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সংবিধানের কিছু ক্ষেত্রে সংশোধন আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মতবিনিময় সভা চলে। মাঝে নামাজ ও দুপুরের খাবারের এক ঘণ্টার বিরতি দেওয়া হয়।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, কাঠামো ও কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে অনেকে বিভিন্ন ধারণা দিয়েছেন। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে এবং সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পরও উচ্চকক্ষ বহাল থাকলে, সেখান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কি না, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

উচ্চকক্ষে উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। বিকল্প হিসেবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায় কি না, সেই ধারণাও দিয়েছেন কেউ কেউ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য উপদেষ্টাদেরও দুই দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের বিধান রাখার প্রস্তাব এসেছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এসব প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া ও কর্মপরিধি সম্পর্কে সবাইকে লিখিত মতামত দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। আরও প্রস্তাব এলে কমিটি সেগুলো প্রতিবেদনে তুলে ধরবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিচার বিভাগকে বাইরে রেখে এবং রাষ্ট্রপতির সর্বশেষ বিকল্পটি বাদ দিয়ে কীভাবে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যায়, সে বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। কমিটি প্রত্যেকের মতামত পর্যালোচনা করবে। তাঁরা চান, সমঝোতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা গড়ে উঠুক।

আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব, নির্বাহী বিভাগ ও আইন প্রণয়নসংক্রান্ত কার্যক্রমের ওপর বিচার বিভাগের পর্যালোচনার ক্ষমতা এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন।

বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর এবং উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাব এসেছে। এ ছাড়া ৬৪ জেলা ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া এবং মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

সরকারি হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানবিষয়ক কমিটির মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির পাশাপাশি পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব বিচার বিভাগের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এর পরিবর্তে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা যায় কি না, সে প্রস্তাবও এসেছে। উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধিত হয়ে যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশের মত, সংসদকে সংশোধনীর মাধ্যমে আদালতের রায় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও কিছু সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘স্ট্যাটুটরি কনস্টিটিউশনাল বোর্ড’ নামে একটি নতুন ধারণা তুলে ধরেছেন কেউ কেউ। সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠন ও কর্মপরিধি এমনভাবে নির্ধারণ করা যায় কি না, যাতে সেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপির দেওয়া আপত্তির বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিরোধী দলকে কমিটির বৈঠকে এসে তাদের মতামত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপত্তি শিথিল করার প্রস্তাব দিলে কমিটি তা বিবেচনা করতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে বিভিন্ন ত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কমিটির আলোচনায় রয়েছে।

২০১১ সালের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার মতো এবারও প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ওই সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার বিষয়ে একমত হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তা বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তখন একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা ছিল, যা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না।

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, রাগীব রউফ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ একরামুল হক, অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান, ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন প্রমুখ।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *